নীড় / পোল্ট্রী / সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি শিল্পঃনিয়ন্ত্রনহীন বাজার ব্যবস্থা

সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি শিল্পঃনিয়ন্ত্রনহীন বাজার ব্যবস্থা

মাহ্ফুজুর রহমান

বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার একটি দেশ। পোল্ট্রি শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান, ধারাবাহিক উন্নতি নিঃস্বন্দেহে গৌরবের বিষয়। যেখানে শিক্ষিত বেকার যুবকেরা চাকুরি না পেয়ে আত্বহত্যার পথ বেছে নেয়, সেখানে পোল্ট্রি শিল্প এই বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করার পথ উন্মোচিত করে দিয়েছে।  লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক বর্তমানে চাকুরির জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করছে,এবং দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখছে।

আশির দশকে যেখানে পোল্ট্রি শিল্পে  বিনিয়োগ ছিলো মাত্র ১৫০০ কোটি টাকা ,আজ সেখানে পোল্ট্রি শিল্পের বিনিয়োগ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এবং এখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে  প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। জিডিপি’তে পোল্ট্রি শিল্পের অবদান প্রায় ২.৪ শতাংশ। প্রায় দেড়কোটি মানুষ এই পোল্ট্রি শিল্পের উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন যাপন করছে। যার ৪০ শতাংশ নারী। নারীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এবং নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে পোল্ট্রি শিল্প ব্যপক ভূমিকা রেখে চলেছে। গার্মেন্টস শিল্পের পর পোল্ট্রি শিল্পই নারীদের বৃহৎ কর্মসংস্থান তৈরি করতে সামর্থ হয়েছে।

বর্তমান দেশে ছোট বড় পোল্ট্রি খামার রয়েছে প্রায় ৮০ হাজার। যেখানে গড়ে  প্রতিদিন দুই থেকে সোয়া দুই কোটি  ডিম উৎপাদন হচ্ছে এবং  মুরগির মাংশ উৎপাদন হচ্ছে দৈনিক প্রায় দেড় হাজার মেট্রিক টন ।

যা আমাদের দেশের নারী ও যুবকদের  নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও ব্যপক ভূমিকা পালন করছে। বিশেষত বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত ও নিম্ন- মধ্যবিত্তদের আমিষের চাহিদার সিংহভাগ পূরন হচ্ছে পোল্ট্রির মাংশ ও ডিমের মাধ্যমে।

বর্তমান পোল্ট্রি শিল্পের উন্নতির ধারাবহিকতাকে অক্ষুন্ন রেখে বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহন করলে এর উৎপাদন আরও কয়েকগুন বাড়ানো সম্ভব। এবং এই পোল্ট্রি শিল্পকে একটি রপ্তানিমুখী শিল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রপ্তানি খাত থেকে আয় করা সম্ভব। এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিষফোঁড়া হিসাবে আবির্ভূত বেকার সমস্যার  সমাধান করা সম্ভব।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো এতো সম্ভাবনা থাকার পরও পোল্ট্রি শিল্প আজ নানমুখি সমস্যায় জর্জরিত। অভিভাবকহীন পরিবারের ন্যায় বিবিধ অস্থিরতা দানা বাধতে শুরু করেছে পোল্ট্রি শিল্পে। বিশেষত বাজার ব্যবস্থার তদারকি না থাকার কারনে বিরাট সম্ভাবনার পোল্ট্রি শিল্প আজ হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। যেখানে একটি ডিমের উৎপাদন খরচ প্রায় ৬ টাকা সেখানে বিগত প্রায় ৩ বছর ধরে এটি পাইকারি বাজারে বিক্রি হয়েছে ৪ থেকে ৫ টাকা দরে। যার ফলে খামারিদের বৃহৎ একটি অংশ লোকসান করতে করতে পথে বসেছে। এবং দীর্ঘদিন লোকসান অব্যাহত থাকায় তারা ব্যবসা গোটাতে বাধ্য হয়েছে। এবং এভাবে ছোট এবং মাঝারি খামারের প্রায় ৮০ শতাংশ খামার বন্ধ হয়ে গেছে।

ছোট এবং মাঝারি সিংহভাগ খামার বন্ধ হয়ে যাওয়াতে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় ডিমের উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই কমে গেছে। যার ফলে এখন আবার সাধারন মানুষদের চড়া মূল্যে ডিম কিনে খেতে হচ্ছে।

অন্যদিকে পোল্ট্রি মুরগির মাংশের বাজারে বর্তমানে অস্থিরতা  শুরু হয়েছে। এক কেজি পোল্ট্রি মুরগির মাংশ উৎপাদন করতে যেখানে খামারিদের খরচ প্রায় একশত টাকা সেখানে তাদেরকে এক কেজি মুরগির মাংশ বিক্রি করতে হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা দরে।  দীর্ঘ প্রায় ৩ মাস এভাবে বাজার নিম্নমুখি রয়েছে। যার ফলে খামারিদের অনেকে এখন পোল্ট্রি চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অধিকাংশ খামারি পথে বসতে বাধ্য হবে। যারা খুদ্র ঋন নিয়ে খামার শুরু করেছিলেন তারা আজ ঋনের ভারে জর্জরিত। ঋন পরিশোধ করতে যেয়ে অনেকের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করতে হচ্ছে।

এভাবে চলতে থাকলে খামার একের পর এক বন্ধ হতে থাকবে। এবং কিছুদিন পর চাহিদার তুলনায় পোল্ট্রি মুরগি উৎপাদন কমে গেলে আবারও চড়াদামে পোল্ট্রি মুরগি কিনতে বাধ্য হবেন ভোক্তারা। এবং বেকার সমস্যার বৃদ্ধি হওয়ার ফলে সমাজে নানাবিধ অন্যায় বাড়তে থাকবে। সার্বিক সামাজিক অবস্থার অবনতি হতে থাকবে। যা আমাদের কখনোই কাম্য হতে পারেনা।

পোল্ট্রি শিল্পের ব্যয়ের ৭০ ভাগই ব্যয় করতে হয় পোল্ট্রি ফিডে। যার কাঁচামাল অধিকাংশ এখনো আমদানি নির্ভর। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরের পূর্বে পোল্ট্রি শিল্পের আয় করমুক্ত থাকলেও ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে নতুন করে ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, এছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং এনওসি প্রাপ্তি,কাষ্টম ক্লিয়ারিং, পন্য খালাসে জটিলতা, পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি সহ নানা কারনে ফিড উৎপাদন খরচ বেড়েছে বহুগুন। যার প্রভাব সরাসরি খামারিদের উপর পড়ছে।

বর্তমান সময়ে পোল্ট্রির এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা সহ নানাবিধ রোগের মোকাবেলা করতে যেয়ে খামারিদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এছাড়াও ফিড,মেডিসিন এর দাম বৃদ্ধির কারনে খামারিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তারা পোল্ট্রি শিল্পের প্রতি সরকারের নজরদারী বাড়ানোর জন্য দাবি জানিয়েছে।

সহনীয় মূল্যে  খামারিদের প্রয়োজনীয়  ফিড, মেডিসিন, ভ্যাকসিন, এডিটিভ্স সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পথে পথে পরিবহন খাতের চাঁদাবজি বন্ধ করে তাদের পরিবহন ব্যয় কমানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব। কাঁচামাল আমদানির উপর শুল্ক মওকুফ করা জরুরী। আমদানিকৃত পন্য খালাস করতে যেয়ে বন্দর, ঔষধ প্রশাসন এবং কাষ্টমস কর্তৃক যে হয়রানির স্বীকার হতে হয় সেটি বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে।

স্বল্প সূদে পোল্ট্রি শিল্প ব্যবসার সাথে জড়িতদরে ঋনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারন বর্তমান আমাদের দেশে পোল্ট্রি শিল্পের সাথে বৈদেশিক বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান যুক্ত আছে। দেখা যাচ্ছে  তারা ৪ খেকে ৫ শতাংশ সূদ হারে ঋন নিয়ে এসে আমাদের দেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে। যেখানে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে সূদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। যার ফলে ব্যবসায় একটি অসম পরিবেশ বিরাজ করছে। দেশীয় ব্যবসায়ীরা বিদেশি ব্যবসায়ীদের সাথে তাল মিলিয়ে ব্যবসা করতে যেয়ে রীতিমতো  হিমশিম খাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে হয়ত বৈদেশিক কোম্পানির এদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে দেশীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ঠিক রেখে নিতিমালা তৈরি করতে হবে, অন্যথায় কম সূদে দেশীয় ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ নিশ্চিত করতে হবে।

পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্ঠ খামারি এবং শ্রমিকদের প্রশিক্ষনের আওতায় নিয়ে আসা দরকার। যথাযথ প্রশিক্ষন দিতে পারলে যেমন ফুড সেফটি নিশ্চিত করা যাবে, পাশাপাশি উৎপাদন খরচ অনেক কমানো সম্ভব হবে। পোল্ট্রি শিল্প বিকাশের প্রয়োজনীয়তা ব্যপকহারে প্রচারনা করা দরকার। আমরা পোল্ট্রির মাংশ বা ডিম সংক্রান্ত অনেক অপপ্রচার হতে দেখেলেও এর সূফল নিয়ে প্রচারনা খুবই কম দেখতে পায়। এটা নিয়ে প্রচারনামূলক  ক্যাম্পেইনের আয়োজন হওয়া দরকার।

পোল্ট্রি শিল্পের আজকের এই অস্থিরতা দূর করে বিকাশমান এই শিল্পকে ধরে রাখার জন্য দায়ীত্বশীল মহলের সূ-নজর বর্তমানে খুবই জরুরী। সরকারের উচিত পোল্ট্রি শিল্পের সূফল চিন্তা করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পোল্ট্রি শিল্পের অবদানের কথা চিন্তা করে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে পোল্ট্রি শিল্পকে দাড় করানো। বিশেষত পোল্ট্রি শিল্পের বাজার ব্যবস্থায় সরকারের নিয়ন্ত্রন এখন পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্ঠদের গনদাবিতে পরিনত হয়েছে।  আমরা যেমন মাংশ ও ডিম অতিরিক্ত দামে বিক্রি হোক সেটা চাইনা,তেমনি এটির দাম কমে যেয়ে খামারিদের গলার কাটায় রুপান্তরিত হোক সেটিও দেখতে চাইনা।

বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রগতিকে ধরে রাখার জন্য,বেকার সমস্যা সহ নানাবিধ সামাজিক সমস্যা মোকাবেলার জন্য এবং দেশের  অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পোল্ট্রি শিল্পের সমস্যার আশু সমাধানে  সরকারের হস্তক্ষেপ অত্যান্ত  জরুরী।

লেখক-

ডি,জি,এম

এগ্রোভেট ফার্মা

মোবাইল: ০১৭১৩৭৯৫২১১

ই-মেইল:mahfuz.agrovet@gmail.com

লেখকঃ Mahfuzur Rahman

Mahfuzur Rahman
Genarel Manager Agrovet Pharma

এটাও দেখতে পারেন

মুরগির লিভারের রোগ: লিম্ফয়েড লিউকোসিস

লিম্ফয়েড লিউকোসিস মুরগীর টিউমার সৃষ্টিকারী ভাইরাস রোগ। এ রোগের ক্ষেএে টিউমার সৃষ্টি হয় এবং রেট্রো …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *