নীড় / পোল্ট্রী / প্রাণঘাতী রোগ মারেক্স: কারণ ও প্রতিকার

প্রাণঘাতী রোগ মারেক্স: কারণ ও প্রতিকার

পোল্ট্রি শিল্পে মারেক্স দমন আধুনিক কৃষি জগতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৯৬০ এর মধ্যভাগে এ রোগ বাণিজ্যিক পোল্ট্রি শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য হুমকি হয়ে দাড়িয়েছিল। কিন্তু অভূতপূর্ব আবিস্কার , পরিজ্ঞান এবং সহয়োগিতার ফলে দ্রুত একটি কার্যকর ভ্যাকসিন আবিস্কার ও ব্যবসায়িকভাবে বাজারজাতকরণ সম্ভব হয়েছিল। যদি ও ভ্যাকসিন সহজলভ্য, তথাপি মারেক্স (marex) পোল্ট্রি খামারের জন্য প্রধান সমস্যা। এ জন্য উৎপাদক ও ব্রিডারের জন্য এটি অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়।

এটি একপ্রকার ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট মুরগির লিম্ফোপ্রোলিফারেটিভ রোগ। এ রোগকে ফাউল প্যারালাইসিসও বলা হয়ে থাকে। বিশ্বের অনেক দেশেই এ রোগ হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও এ রোগ হয়ে থাকে তবে তা সাধারণত উন্নতজাতের মুরগিতেই দেখা যায়। সব বয়সের মুরগিতেই এ রোগ হতে পারে তবে প্রধানত ২-৫ মাসের বাড়ন্ত মুরগি এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। আক্রান্ত মুরগির বহিরাভাগের স্নায়ু এবং অনেক সময় গোনাড, বিভিন্ন ভিসেরাল অঙ্গ, ত্বক, চোখ, মাংস ইত্যাদিতে ও রোগের সৃষ্টি হয়। এ সমস্ত ক্ষতস্থানে প্রধানত লিম্ফোব্লাষ্ট এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের লিম্ফোসাইট এবং কখন ও কখন ও প্লাজমা কোষের অনুপ্রবেশ ঘটে।

১৯০৭ সালে মারেক নামক জনৈক বিজ্ঞানী হাঙ্গেরীতে এ রোগ আবিস্কার করেন। তারপর হতে এটাকে এভিয়ান লিউকোসিস গ্র“পের রোগের সাথে বর্ণনা করে হয়ে আসছে। অবশেষে ১৯৬৪ সালে একে পৃথক সত্তা হিসাবে চিহিৃত করে নামকরণ করা হয় মারেকস রোগ।

রোগের বিস্তার: প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয়ভাবেই এ রোগের ভাইরাস সুস্থ মুরগিকে আক্রান্ত করতে পারে। বাতাসের সাহায্যে সহজেই এ ভাইরাস এক স্থান হতে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে রোগের বিস্তার ঘটাতে পারে। রোগাক্রান্ত মুরগির ঘরের ধুলাতে এ ভাইরাস কয়েক সপ্তাহ জীবিত থেকে রোগ বিস্তার করতে পারে। আক্রান্ত মুরগির বিষ্ঠা ও লিটারে স্বাভাবিক তাপমাএায় এ ভাইরাস জীবিত থাকতে সক্ষম। কীট পতঙ্গের মাধ্যমে এ ভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে।

এপিডিমিওলজি: পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই উন্নত জাতের মুরগিতে এ রোগ পাওয়া যায়। আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রতি বৎসর বহু মুরগি এ রোগে মারা যায় এবং কোটি কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হয়। প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসারে মুরগিতেই এ রোগ বেশি হয়। তবে হাঁস, কবুতর, কেনারী ও কোয়েল পাখিতে এ রোগ হতে দেখা গেছে। প্রকৃতিতে মুরগি প্রায় ৩ সপ্তাহ বয়সের সময় ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং ২-৫ মাসের মধ্যে তাদের দেহে রোগ লক্ষণ প্রকাশ পায়।

রোগের সাথে বিভিন্ন উৎপাদকসমূহের সর্ম্পক:
১) ভাইরাসের মাএার প্রভাব: যদি অধিক মাএায় ভাইরাস দেহে প্রবেশ করে তাহলে রোগ হবার সম্ভবনা ও অধিক দেখা দেয়।
২) দেহে অনুপ্রবেশ পথ: ভাইরাস যদি নাক দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে তাহলে রোগ হবার সম্ভবনা অধিক।
৩) লিঙ্গের প্রভাব: এ রোগ প্রধানত: মোরগের চেয়ে মুরগিতেই অধিক হয়।
৪) বংশের প্রভাব: কোন কোন বংশের মুরগির দেহে এমন কতক জিন রয়েছে যা মুরগির দেহে ভাইরাস দ্বারা রোগ সৃষ্টি হওয়া প্রতিহত করে। সাধারণতঃ দেশী জাতের মরগিতে এ ধরনের অনাক্রম্যতা দেখা যায়।আমাদের দেশীয় মুরগিতে এ রোগ এ কারণে এখনো হতে দেখা যায় না। উন্নত জাতের মুরগি এ রোগের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
৫) বয়সের প্রভাবঃ অল্প বয়স্ক মুরগি রোগের প্রতি অধিক সংবেদনশীল। বয়সের সাথে ক্ষতের সর্ম্পক অত্যন্ত সুষ্পষ্ট। অল্প বয়স্ক মুরগিতে র্নাভ অধিক আক্রান্ত হয় আর বয়স্ক মুরগিতে ভিসেরাল অধিক আক্রন্ত হয়।

রোগের লক্ষণ: আক্রান্ত মুরগির জাত, বয়স ও ভাইরাসের স্ট্রেইনের ওপর এ রোগের লক্ষন নির্ভর করে। ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার পর আক্রান্ত বাচ্চার রোগ লক্ষন প্রকাশ পেতে প্রায় ৩ সপ্তাহ লাগে। স্নায়ু বা নার্ভ প্রকৃতির রোগে দেহের বহিরাভাগের র্নাভগুলো বিশেষ করে ব্রেকিয়াল (Brachial) এবং লামবো সেকরাল প্লেকসাসের (lumbo-sacral plexus) র্নাভগুলোই অধিক আক্রান্ত হয়।তবে ম¯িতস্ক এবং দেহের অন্যান্য র্নাভগুলোও আক্রান্ত হতে পারে। কোন ফার্মে যখন এ রোগের প্রার্দুভাব ঘটে তখন অনেকগুলো মোরগ মুরগিতে প্রায় এক সঙ্গে লক্ষণ প্রকাশ পায়। মুরগিগুলোকে দুর্বল দেখা যায়। এর পর পায়ে ও পাখায় পক্ষাঘাত দেখা দেয়। কিছু মুরগিতে লক্ষণ প্রকাশ পাবার পূবেই মৃত্যু ঘটে। যখন এক পায়ে পক্ষাঘাত দেখা দেয় তখন তারা কোন প্রকার খুড়িয়ে হাঁটতে থাকে। যখন দুপায়ে পক্ষাঘাত হয় তখন চলৎশত্তি হারিয়ে তারা শুয়ে থাকে। যখন পাখাতে পক্ষাঘাত হয় তখন সেটা ঝুলে পড়ে।ঘাড়ে অবসঙ্গতা হলে মাথা একদিকে বাঁকা হয়ে যায়। মস্তিস্ক আক্রান্ত হলে দেহে খিচুনী দেখা দেয়। চক্ষু প্রকৃতির রোগে চোখের আইরিস, পিউপিল, সিলিয়া আক্রান্ত হয়। এ রোগে আইরিসের রং উঠে যায় এবং বর্ডার ভাজঁ ভাজঁ দেখায়। পরিশেষে মুরগির অন্ধত্ব দেখা দেয়। দীর্ঘস্থায়ী রোগের ক্ষেএে মুরগির দৈহিক ওজন হ্রাস পায় , আক্রান্ত মুরগি ফ্যাকাশে হয়ে যায় ও ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়। এর সাথে ডায়রিয়াও দেখা যেতে পারে। এসব কারণে আকান্ত মুরগি অনাহার ও পানিশূন্যতায় মারা যায়। এ রোগটি র্নিণয় করা বেশ জটিল বিধায় খামারিগণকে অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।

মারেক্স রোগে আক্রান্ত মুরগিতে প্যারালাইসিস মারেক্স রোগে আক্রান্ত মুরগিতে ঘাড়ে প্যারালাইসিস

চিএ: মুরগীর বৈশিষ্ট্যর্পুণ প্যারালাইসিস (ঘাড় বেকে যাওয়া, পা ও ডানা আক্রান্ত হওয়ার কারণে সৃষ্ট পক্ষাঘাত)

পোস্টর্মটেমে প্রাপ্ত তথ্যাদি:
You should logged in as Veterinarian to see this section

মারেক্স ও লিম্ফয়েড লিউকোসিস রোগের পার্থক্য:

বিবেচ্য বিষয় মারেক্স রোগ লিম্ফয়েড লিউকোসিস
বয়স ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ বয়সের মুরগি হতে আরম্ভ হয় তবে ১২ থেকে ৩০ সপ্তাহ বয়সের মোরগ মুরগিতে অধিক হয়। সাধারণত ১৬ সপ্তাহ বয়সের পূর্বে রোগ লক্ষণ প্রকাশ পায় না তবে ২৪-৪০ সপ্তাহ বয়সের মোরগ মুরগিতে অধিক হয়।
অবসঙ্গতা আছে নেই
নার্ভ
চোখ আক্রান্ত হয় আক্রান্ত হয় না
ত্বক আক্রান্ত হয় আক্রান্ত হয় না
বারসা ফেব্রিকাস
ভাইরাস ডি এন এ হারপিস গ্র“প আর এন এ মিক্সো গ্র“প
নিওপ্লাস্টিক কোষ
কেন্দ্রিয় স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয় আক্রান্ত হয় না
টিউমারকোষ প্রকৃতি বিভিন্ন আকৃতির লিম্ফয়েড কোষ যেমন লিম্ফোব্লাষ্ট, ছোট, মাঝারি ও বড় আকৃতির লিম্ফোসাইট ও রেটিকুলাম কোষ শুধু লিম্ফোব্লাষ্ট
সংক্রমণ সংর্স্পশ ডিমের মাধ্যমে এবং সংর্স্পশ

প্রতিরোধ ব্যবস্থা: খামারের পরিবেশ সবসময় স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে হবে। আক্রান্ত মুরগিকে সুস্থদের থেকে অতি দ্রুত সরিয়ে ফেলতে
হবে। বয়স্ক মুরগি থেকে ছোট বাচ্চাকে স্বতন্ত্রভাবে লালন-পালন করতে হবে। খামারের জৈবনিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করতে হবে। বহিরাগত কোন ব্যত্তিকে খামারে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। খামারে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি ও মুরগির পালকের সাহায্যে ভাইরাস এক শেড থেকে অন্য শেডে, এমনকি এক খামার থেকে অন্য খামারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ব্যবস্থা প্রতিরোধকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভ্যাকসিন প্রয়োগ: মারেক্স রোগ প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন প্রদানই একমাএ সর্বাপেক্ষা কার্যকর ব্যবস্থা।

Reference: 1) Mareks Disease (Viral) By: K. J. Theodore, Edited by: Doris Robinson for youth studies 2) Mareks disease by OIE, 2010 ৩) পোল্ট্রি র রোগব্যাধি, ভ্যাকসিন নির্দেশিকা ৪) মুরগী ও অন্যান্য প্রাণীর রোগতত্ত বাই মো: নজরুল ইসলাম

লেখকঃ ডা: আবুল হাসনাত মোহাম্মদ সাইদুল হক

Avatar
আবুল হাসনাত মোঃ সাইদুল হক, ডিভিএম।

এটাও দেখতে পারেন

সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি শিল্পঃনিয়ন্ত্রনহীন বাজার ব্যবস্থা

মাহ্ফুজুর রহমান বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার একটি দেশ। পোল্ট্রি শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান, ধারাবাহিক উন্নতি নিঃস্বন্দেহে গৌরবের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.