নীড় / পোল্ট্রী / অপরিকল্পিত ভাবে প্যারেন্ট স্টক আমদানি করাই হলো একদিন বয়সী লেয়ার বাচ্চা ও ডিমের মূল্য উঠানামা করার মূল কারনঃ

অপরিকল্পিত ভাবে প্যারেন্ট স্টক আমদানি করাই হলো একদিন বয়সী লেয়ার বাচ্চা ও ডিমের মূল্য উঠানামা করার মূল কারনঃ

অপরিকল্পিত ভাবে প্যারেন্ট স্টক আমদানি করাই হলো একদিন বয়সী  লেয়ার বাচ্চা ও ডিমের মূল্য উঠানামা করার মূল কারনঃ
বিগত কয়েক বছর খেয়াল করলে দেখা যায় যে, একদিন বয়সী লেয়ার বাচ্চা ও ডিমের মূল্য বেশ উঠানামা করছে। ২০০৭-২০০৮ সালে খুবই কম মূল্যে বাচ্চা ও ডিম পাওয়া গেছে। আবার ২০০৯-২০১০ সালে ডিম ও বাচ্চার মূল্য খুবই ভাল ছিল। ২০১১ সালে এসে ডিম ও বাচ্চার মূল্যে দারুনভাবে ধস নামে। বর্তমানে এই দুটি পন্যের  মূল্য আবার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এটা আগামী ২০১৪ সালের আগে কমবে বলে মনে হয়না। এই যে উঠানামা করছে এতে করে ভোক্তা ও উৎপাদক উভয়ই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এবং হবে। কিন্তু কেন এই মূল্য উঠানামা? আমরা হয়তো অনেকেই ভাবছি বার্ড ফ্লু ও খাদ্য মূল্য বৃদ্ধির কারনে এমনটি হতে পারে। বিষয়টি এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ঠ সবাইকে অবহিত করার জন্যই আজ আবার দু চারটি লাইন লিখতে বসেছি।
আমি পাঠকদের প্রথমেই নিন্মের টেবিলের দিকে দৃষ্টি আকর্ষন করাবো।
সাল    লেয়ার প্যারেন্ট
২০০৬    ৩,৩০,০০০
২০০৭    ৩,৫০,০০০
২০০৮    ২,৭৬,০০০
২০০৯    ৪,৩০,০০০
২০১০    ৪,৭৫,০০০
২০১১    ৩,৫০,০০০

এই টেবিলের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ২০০৭ সালে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হওয়ার আগে ২০০৬ সালে ৩,৩০,০০০ প্যারেন্ট আমদানি হয়েছিল। ২০০৭ সালে মার্চে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রমিত হলেও প্রায় ৩,৫০,০০০ প্যারেন্ট আমদানি করা হয়। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার কারনে ডিম ও বাচ্চার মূল্য অত্যধিক কমে যাওয়ার কারনে হ্যাচারী মালিকরা ভয়ে ভয়ে মাত্র ২,৭৬,০০০ প্যারেন্ট আমদানি করেছিলেন। এর মাঝে আবার এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার কারনে অনেক হ্যাচারী বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ২০০৮ ও ২০০৯ সালে লেয়ার বাচ্চা কম পাওয়ায় চাহিদার তুলনায় ডিমের উৎপাদনও কমে যায়। ২০০৮ সালের প্যারেন্টের এই ঘাটতির কারনেই ২০০৯ ও ২০১০ সালে ডিমের দাম কিছুটা ভাল থাকে। তাই খামারীরা আবার লেয়ার বাচ্চা উঠানো শুরু করলেও চাহিদার তুলনায় লেয়ার বাচ্চার সরবরাহ কমে যাওয়ার কারনে বাচ্চার দামও ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।ঐ সময়ে সরকার না বুঝেই একদিন বয়সী লেয়ার বাচ্চার দাম ৩২ টাকা নির্ধারন করলেও তা কার্য্যকর হয়নি। কারন বাজারে সরবরাহ কম থাকলে নিয়মনীতি দিয়ে কোন কাজ হয় না।এই দাম বাড়ার প্রবনতা দেখে পূরুনো হ্যাচারী গুলো ছাড়াও বেশ কিছু নতুন হ্যাচারীর উদ্ভব হলো । আর যার পর নাই প্যারেন্ট আমদানি শুরু করে দিল। লক্ষ্য করুন ২০০৯ সালে আমদানিকৃত প্যারেন্টের সংখ্যা পূর্ববর্তি বছরের তুলনায় প্রায় ৫৬% বেশী এবং ২০১০ সালে তা আরও প্রায় ১১% বেড়ে দাড়ালো ৪,৭৫,০০০ এ। অপরদিকে এই দুই বছরে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার কারনে মুরগির খুব একটা সমস্যাও হয়নি। যার কারনে বর্ধিত এই প্যারেন্টস্টক হইতে উৎপাদিত একদিন বয়সী লেয়ার বাচ্চা ও ডিমের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশী হয়ে গেল। আর তাই ২০১১ সাল সারা বছর ব্যাপি লেয়ার বাচ্চার দাম ১০-১৫ টাকায় এবং ডিমের দামও প্রতিটা ৪.৫০ টাকায় নেমে এল।এই সময়ে সরকারের নির্ধারিত ৩২ টাকায় কেউ বাচ্চা বিক্রয় করতে পারেনি। তাই ২০১০ এ যারা নতুন ভাবে হ্যাচারী প্রতিষ্ঠা করেছিল তারা ব্যাপক হারে লোকসান গুনতে শুরু করলো। এই কারনে ২০১১ সালে প্যারেন্ট আমদানি কমে গিয়ে আবার ৩,৫০,০০০ এ দাড়াল। এই যখন অবস্থা, তখন ২০১১ সালের নভেম্বর থেকে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রাদূর্ভাব ব্যাপকভাবে দেখা দিল এবং তা ২০১২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অব্যাহত থাকলো। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার কারনে ২০১১ সালের নভেম্বর থেকে ২০১২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৪৭% বানিজ্যক খামার ও ৫৯% লেয়ার ব্রীডার ফার্ম বন্ধ হয়ে গেল। একদিকে প্যারেন্ট কম আনা হলো অন্য দিকে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার কারনে অনেক প্যারেন্ট শেষ হয়ে গেল। আবার ২০১১ সালের শেষের দিকে কিছু বড় বড় হ্যাচারী প্যারেন্ট আমদানির আবেদন করলেও মন্ত্রনালয় থেকে দেরিতে অনুমতি প্রদান করায় সমস্যা আরও বেড়ে গেল। ফলাফল যা হবার তাই হলো, বর্তমানে একদিন বয়সী লেয়ার বাচ্চার দাম যেমন আকাশচুম্বি,তেমনি ডিমের দামও অনেক বেশী। তাই এই প্যারেন্টের প্রয়োজনের তুলনায় কম বেশী হওয়ার কারনেই আজকে বাচ্চা ও ডিমের দাম কম বেশী হচ্ছে। আমদানি করেও স্থিতিশিল রাখা যাচ্ছে না।
এবার আসি কি পরিমান লেয়ার প্যারেন্ট আমদানি হওয়া দরকার। আমাদের দেশে মোটামুটি ৪,০০,০০০ প্যারেন্ট প্রতিবছর নিয়মিত আমদানির ব্যবস্থা করতে পারলে এই সংকট তৈরী হবে না। প্রতি বছর ১০% করে বৃদ্ধি করে প্যারেন্ট আমদানির ব্যবস্থা নিলে আগামী দিনে তা ভোক্তা ও উৎপাদন কারী সকলের জন্য মঙ্গলজনক হবে। আমাদের প্রাণি সম্পদ মন্ত্রনালয় যেহেতু আমদানির  অনুমোদন দিয়ে থাকে, তাই তারাই এর প্রকৃত সংখ্যা নিরুপন করে ব্রীডার ফার্ম মালিকদের উৎসাহিত করবেন যাতে করে প্রতিবছর যেন প্রয়োজন অনুসারে প্যারেন্ট আমদানি করা হয়। তাহলে বাচ্চার উৎপাদন সারাবছর ব্যাপি প্রায় একই ও সহনীয় পর্যায়ে থাকবে এবং ডিমের মূল্য সঠিক থাকবে। সবাই লাভবান হবেন। সরকারও সমালোচিত হবে না। এই বিষয়টি যদি সরকার সঠিকভাবে করতে পারে,তাহলে ডিম ও বাচ্চার দাম বছরের পর বছর একই হারে থাকবে। যদি কোন কারনে হ্যাচারী মালিকরা আমদানিতে অনিহা প্রকাশ করে তবে সরকার নিজেই আমদানি করে বাচ্চার বাজার স্থিতিশীল রাখতে পারে। তবে ২০১২ সালে ইতিমধ্যে প্রায় ২,০০,০০০ প্যারেন্ট আমদানি করা হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। আশা করি সরকার ও হ্যাচারী মালিকরা এই বিষয়টির দিকে খেয়াল রাখবেন এবং আগামি ২০১৩ সালের শেষের দিকে আবার খামারীরা যেন ক্ষতির সম্মুখীন না হয়।

লেখকঃ ডাঃ মোহাম্মদ সরোয়ার জাহান

তিনি ডি.ভি.এম ও এম.এস. ইন মাইক্রোবায়োলজি ডিগ্রী অর্জন করেছেন বাকৃবি, ময়মনসিংহ থেকে। বর্তমানে টেকনিক্যাল ম্যানেজার হিসেবে ফিনিক্স হ্যাচারী লিমিটেড-এ কর্মরত। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ সোসাইটি ফর ভেটেরিনারি মাইক্রোবায়োলজি এণ্ড পাবলিক হেল্থ-এর আজীবন সদস্য। যোগাযোগঃ ০১৭১১৬১৮৫৯৩,০১৯১৬২০৩২৪৬, dr.sorwar@yahoo.com

এটাও দেখতে পারেন

মুরগির লিভারের রোগ: লিম্ফয়েড লিউকোসিস

লিম্ফয়েড লিউকোসিস মুরগীর টিউমার সৃষ্টিকারী ভাইরাস রোগ। এ রোগের ক্ষেএে টিউমার সৃষ্টি হয় এবং রেট্রো …

২ মন্তব্য

  1. ভাইয়া খুব ভাল লেগেছ। আপনাদের কাছে পোল্ট্রী রোগ বিষয়ক লেখা আশা করি, তাহলে আমরা নতুন ভেটেরিনারি সার্জনরা উপকৃত হব।

  2. এই সাইটের সাতে আজই নতুন পরিচয়। আপনার মধ্যমে অনেক কিছুই জানতে পারলাম।
    আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। নিয়মিত আপডেট ও মন্তব্যের রিপ্লাই হলে আরো ভাল লাগবে। আবারো ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *