নীড় / পোল্ট্রী / প্রসঙ্গঃ এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশের প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস: পোল্ট্রি শিল্প ও তা রক্ষার্থে করণীয় (৩য় ও শেষ পর্ব)

প্রসঙ্গঃ এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশের প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস: পোল্ট্রি শিল্প ও তা রক্ষার্থে করণীয় (৩য় ও শেষ পর্ব)

কেমন আছেন সবাই? আশা করছি বেশ ভালোই আছেন। আজ শেষ পর্ব উপস্থাপন করছি। এতে থাকছে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে মুক্তির উপায় ও আমাদের পোল্ট্রী শিল্প রক্ষার্থে করণীয় বিষয় সমূহ।

আমার আগের ২টি পর্বে আপনারা যা দেখেছিলেন তা হলো-

১ম পর্ব: আমাদের জীবনে পোল্ট্রী শিল্পের কি অবদান

২য় পর্ব:

১। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের গৃহিত পদক্ষেপ সমূহ

২। বাংলাদেশে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রমনের বিভিন্ন পরিসংখ্যান ( বছর অনুযায়ী বানিজ্যিক খামার, পারিবারিক খামার, প্যারেন্ট স্টক-এ সংক্রমন) ও তার বিশ্লেষন

৩। কি কি কারণে আমরা এখনও এই রোগ থেকে মুক্ত হতে পারলাম না

৩য় ও শেষ পর্ব:

আজকে পোল্ট্রী শিল্পকে কৃষিখাতের উপখাত মনে করা হয়। উপখাত হিসাবে নয়, এটাকে আলাদা খাত হিসাবে প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস বিবেচনায় নিয়ে এই পোল্ট্রি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে, আমাদের সামাজিক- অর্থনৈতিক অবস্থান, ভৌগলিক অবস্থান, সীমিত আয়তনের দেশে বিশাল জনগোষ্ঠির পুষ্টির চাহিদা মাথায় রেখে নিজস্ব চিন্তা চেতনা, গবেষনার দ্বারা  সমস্যা সমাধানের  উপায় খুঁজে বের করতে হবে। আমি একজন পেশাদার প্রাণি চিকিৎসক ও মাইক্রোবায়োলজিস্ট হিসাবে এবং আমার প্রায় ১০ বছরে সকল ধরনের মুরগি পালনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে  নিজস্ব কিছু সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরলামঃ-

১। সমগ্র দেশে সোনালী, ফাহমি ও দেশী জাতের মুরগি বানিজ্যকভাবে পালনের ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। ঘরোয়া ভাবে মুরগি পালন ধীরে ধীরে বন্ধ করতে হবে। সারা দেশে প্রাথমিক অবস্থায় সম্ভব না হলে, পোল্ট্রি খামার যেখানে বানিজ্যিকভাবে বেশী বেশী গড়ে উঠেছে সেই সকল এলাকায় সরকার ও খামার মালিকরা  এক হয়ে কাজ করে এটা  বন্ধ করতে পারে।  দেশীয়জাত যাতে হারিয়ে না যায় সেইদিকটা খেয়াল করে তা ছোট আকারে বানিজ্যিক ভিত্তিতে পোল্ট্রি নীতিমালা অনুযায়ী করতে হবে।

২। হাঁস ও মুরগী একসাথে পালন করা যাবে না এবং যে এলাকায় হাঁস পালন হবে, সেই এলাকায় মুরগী পালন করা যাবে না। হাঁস পালনের ক্ষেত্রেও বানিজ্যিক ভাবে পালন করতে হবে এবং ঐ এলাকার হাঁস গুলোকে তীক্ষ্ম নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে।

৩। উপরের উভয়ক্ষেত্রে হাঁস ও মুরগিকে চলমান সকল রোগের টীকা প্রয়োগের আওতায় আনতে হবে।

৪। যে সকল এলাকায় ঘরে ঘরে মুক্তভাবে মুরগি পালন করা হয় তাদেরকেও ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে।

৫। এই রোগ নির্নয় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারী ল্যাবেও যাতে করা যায় এবং তা যেন উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রাণি হাসপাতালকে অবহিত করেই করা হয়।

৬। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রনালয় যেমন- কৃষি মন্ত্রনালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রনালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে কাজ করা।

৭। সারাদেশকে ৮-১০ টি অঞ্চলে ভাগ করে তা সার্বক্ষনিক নজরদারিতে রাখার জন্য ঐ সকল এলাকায় অবস্থিত বিভিন্ন কৃষি ও ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের  শিক্ষক, গবেষক, ছাত্র/ছাত্রী ও সরকারী প্রাণি হাসপাতালের কর্মকর্তা, কর্মচারিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সারভিল্যান্স দল রাখতে হবে। যারা সারা বছর ব্যাপি নজরদারি করবে এবং নিজেদের বিকশিত করার পাশাপাশি সরকারকেও সহয়তা করবে।

৮। কোন প্রাণি চিকিৎসক যদি খামারে পরীক্ষা করে বার্ড ফ্লু সনাক্ত করতে পারেন অথবা বুঝতে পারা যাচ্ছে না এই অবস্থায় তা নিকটস্থ কোন সরকারী বা বেসরকারী ল্যাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন যাতে রোগটি সম্পর্কে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া যায়। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

৯। বানিজ্যিকভাবে ও ঘরোয়াভাবে ছোট আকারের খামার সহ সকল খামারে  মৃত ও অসুস্থ মুরগি সৎকারের ব্যবস্থা নিশ্চিৎ করতে হবে। কোনভাবেই যেন মৃত ও অসুস্থ মুরগি বিক্রি অথবা যত্রতত্র ফেলে রাখতে  না পারে সে ব্যাপারে কঠোর আইনানূগ ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

১০। প্রত্যেক ফার্মে যাতে সরকারের গৃহিত নীতিমালা কঠোরভাবে মেনে চলা হয় সেই ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

১১। প্রত্যেক বড় আকারের বানিজ্যক খামার, ব্রীডার ফার্ম ও হ্যাচারীগুলোতে যাতে কমপক্ষে একজন ভেটেরিনারিয়ান ও রোগ নির্নয়ের জন্য ল্যাব থাকে এবং ল্যাবগুলোর মান যেন আদর্শমানের হয় সেই ব্যবস্থাও গ্রহন করতে হবে।

১২। কোন আক্রান্ত দেশ হতে ডিম, মুরগির বাচ্চা, মুরগির মাংস, প্যারেন্ট  আমদানি করা যাবে না।

১৩। সীমান্তে  চোরাই পথে যেন কোন আক্রান্ত দেশ হতে ডিম, মুরগির বাচ্চা, মুরগির মাংস ও প্যারেন্ট আসতে না পারে সেই দিকে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে।

 ১৪। আদর্শমানের খাদ্য, মেডিসিন, ভ্যাকসিন  ব্যবহার নিশ্চিৎ করতে হবে।

১৫। দেশীয় ভ্যাকসিন সকল পর্যায়ের মুরগির জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে।

১৬। আমাদের দেশে যে সকল রোগের জীবানু পাওয়া গেছে তা থেকে তৈরী ভ্যাকসিন বা ব্যাকটেরিন ব্যবহার উত্তম, তবে আমদানি করা ভ্যাকসিন যাতে আমাদের দেশে প্রাপ্ত জীবানুর দ্বারা তৈরী হয়ে থাকে সেটা নিশ্চিৎ করতে হবে।

১৭। যেহেতু সরকারের গৃহিত চলমান পদক্ষেপ সমূহ এই শিল্পকে এখনও একটা  স্থিতিশীল  পর্যায়ে আনতে পারেনি তাই বিদ্যমান গৃহিত চলমান পদক্ষেপ সমূহের পাশাপাশি খামারীদের সর্বশেষ দাবি ও পন্থা হিসেবে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার কার্য্যকর কিল্ড ভ্যাকসিন তৈরী করে তা প্রয়োগ করা জরুরী। এই ক্ষেত্রে আমাদের দরকার  বিশ্বমানের  BSL-3  (বায়ো সেইফটি লেভেল-৩)  মানের  ল্যাব স্থাপন করা যেখানে আমাদের দেশের ভাইরোলজিষ্টরাই এই রোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় গবেষনা কাজ করতে পারবেন। আর এটা করতে যে সময় লাগবে সেই সময়ের মধ্যে আমরা ফাইজার, ইন্টারভেট, মেরিয়াল ইত্যাদি কোম্পানি হতে আমাদের দেশের যে সকল জীবানু পাওয়া গেছে তা পাঠিয়ে কিল্ড ভ্যাকসিন তৈরী করে তা এনে প্রয়োগ করা যেতে পারে। আমাদের দেশের যে সকল মাইক্রোবায়োলজিস্ট আছেন তাদের অনেকেই বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে  ভ্যাকসিন বিষয়ে গবেষনা করে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। তাহলে আমরা কেন তাদেরকে কাজে লাগাতে পারছি না। যদি সরকার তা করতে চান তাহলে আগামী বাজেটে BSL-3 (বায়ো সেইফটি লেভেল-৩) মানের  ল্যাব স্থাপনের  জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্ধ করতে হবে অথবা বেসরকারী পর্যায়ে যাতে স্থাপন করা যায় সেই ধরনের উদ্যোগ সরকারকেই  গ্রহন করতে হবে। এই ব্যাপারে ময়মসসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও হাইজিন বিভাগে কর্মরত সম্মানিত শিক্ষক-বিজ্ঞানী এবং দেশের অন্যান্য গবেষনা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মাইক্রোবায়োলজিস্টদের সহায়তায় এই রোগের বিষয়ে গবেষনা এবং প্রতিরোধের বিষয়ে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। এই ব্যাপারে  সরকারকেই সবার আগে দায়িত্ব নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ডেকে গবেষনার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এই ধরনের গবেষনার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে দেশে নতুন নতুন রোগের কারন নির্নয় ও এর দ্বারা কার্য্যকর ভ্যাকসিন  তৈরী করা যাবে এবং বাইরে থেকে যে সকল ভ্যাকসিন আমদানি করা হয় তা আমাদের কোন উপকারে আসছে কি না তাও পরীক্ষা করে দেখা যাবে। এর ফলে আমাদের দেশের গবেষকরা আরও উন্নতি করবে, দেশের অনেক  বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় রোধ হবে এবং আমাদের এই শিল্পটিও রক্ষা পাবে।

 ১৮। ভ্যাকসিন করার পাশাপাশি সরকারী ও বেসরকারীভাবে সারভিল্যান্স জোরদার করতে হবে। ভ্যাকসিন দেওয়ার পরও যদি কোন রোগের লক্ষন প্রকাশ পায় আর তা যদি বার্ড ফ্লু হয়ে থাকে সংগে সংগে  নিধন করতে হবে এবং ভ্যাকসিন কেন কাজ করল না অথবা নতুন কোন স্ট্রেইন কি না তা বের করে পূনরায় ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। এখানে একটা বিষয় অনেকেই ভুলভাবে উপস্থাপন করে থাকেন যে, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন করলে মুরগি মারা যাবে না কিন্তু ভ্যাকসিন দেয়া মুরগি থেকে ভাইরাসটি মানুষে ছড়াতে পারে এবং মিউটেশন হয়ে নতুন ভাইরাস হতে পারে । এই ধারনাটি ভুল। আমাদের জানতে হবে ভ্যাকসিনটি কি ধরনের এবং তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কোন পর্যায়ের। সাধারনত কোন ভ্যাকসিন প্রয়োগ করার পর প্রাণিদেহে ঐ ভ্যাকসিনের জীবানুর বিরুদ্ধে দুই ধরনের রোগ প্রতিরোধী এন্টিবডি তৈরী হয়। এক. হিউমোরাল এন্টিবডি যা রক্তের মাধ্যমে দেহে অবস্থান করে, দুই. সেলুলার এন্টিবডি যা প্রাণিকোষে অবস্থান করে। কিল্ড ভ্যাকসিনগুলো থেকে আমরা  হিউমোরাল এন্টিবডিই বেশী পাই। এই এন্টিবডিগুলো প্রাণিদেহে রক্তে সর্বদা প্রহরীর মতো কাজ করে। যখনি ঐ জীবানু দেহে প্রবেশ করে সংগে সংগে দেহের রক্তে অবস্থিত এন্টিবডি দ্বারা তা ধ্বংস হয়ে যায় অথবা রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাসটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, ফলে প্রাণিতে কোন সমস্যা হয় না, এতে ক্ষতিকর জীবানুর লোড ও কমে যায়।

যদি দেহে তৈরী এন্টিবডির তুলনায় ফিল্ড ভাইরাসের লোড বেশী হয়ে যায় অথবা ভ্যাকসিনটি যদি কোন কারনে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধী এন্টিবডি তৈরী করতে না পারে তাহলে একটা নির্দিষ্ট সময় পর রোগের লক্ষন প্রকাশ পাবে। তখন দেখতে হবে এটা অন্য কোন স্ট্রেইন দ্বারা হলো কি না বা বিদ্যমান ভাইরাসটি তার প্রকৃতি পরিবর্তন করল কি না। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে পূনরায় ঐ স্ট্রেইনের ভ্যাকসিন তৈরী করতে হবে। এই জন্য ভ্যাকসিন করার পর মুরগিকে নিবিড় পর্যবেক্ষনে  রাখতে হবে। আর একটা বিষয় মনে রাখতে হবে সকল ভাইরাল ভ্যাকসিন ৮০-৮৫% এর বেশী কার্য্যকর নয়। তাই ভ্যাকসিন করে ৮০ ভাগ সফল হলে বাকি ২০ ভাগ জীবনিরাপত্তা ও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে সফল করতে হবে। সকল ভ্যাকসিনের বেলায়ই এ কথাটি প্রযোজ্য।  যেহেতু এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের স্ট্রেইনগুলো প্রকৃতিগত কারনেই একে অপরকে প্রতিরোধ করতে পারে না তাই যে স্ট্রেইন দ্বারা রোগের সৃষ্টি সেই স্ট্রেইন দ্বারা তৈরী ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে হবে। ভ্যাকসিনটি কিল্ড হতে হবে। কিল্ড ভ্যাকসিনের ভাইরাস মৃত হওয়ায় ভ্যাকসিন ভাইরাস কোন রোগ সৃষ্টি করবে না এবং এটির মিউটেশনের কোন সুযোগ নাই।

 ১৯। পোল্ট্রিতে ভ্যাকসিন করার পাশাপাশি খামারে কর্মরত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জীবনিরাপত্তা কঠোর ভাবে মেনে চলতে হবে এবং প্রয়োজনীয় এন্টি ভাইরাল এখন যেটা সরকারীভাবে দেওয়া হয় তা প্রত্যেক ফার্মে রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। তাছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগকেও এখনকার মতোই সতর্ক থাকতে হবে।

 ২০। খামারীর ক্ষতিপূরনের টাকা মুরগির বাজার মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে যে দিন নিধন করা হবে সেই দিনই চেকের মাধ্যমে প্রদান করতে হবে।

 ২১। খামার মালিক, হ্যাচারী মালিক, ফিড মিল মালিক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর মিলে একটি কার্য্যকর পদ্বতি বের করবেন  যাতে দেশে একই ধারায় গ্র্যান্ড প্যারেন্ট, প্যারেন্ট দেশের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে আমদানি করা হয় যাতে বাচ্চার দাম সারা বছর একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে উঠানামা করে। তদ্রুপ ডিম ও ব্রয়লার মাংসের দামের বেলায়ও সারা বছর ব্যাপি যেন একটা সহনীয় মাত্রায় থাকে তার জন্য একটা নীতিমালা করতে হবে। এছাড়া বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময় ডিমের দাম কমে যায় যেমন- রমজান মাসে, অধিকমাত্রায় গরম পড়লে, এই সময়ের ডিমগুলো যাতে কোল্ড স্টোরেজ করে ১/২ মাস সংরক্ষন করা যায় তার ব্যবস্থা গ্রহন করলে রমজান মাসের পরে উৎপাদনকারী ও সাধারন ক্রেতারা উভয়ই লাভবান হবেন। ডিমের বাজার যাতে মধ্যসত্ব-ভোগীদের হাতে না থাকে সেই জন্য সরকার ও ডিম উৎপাদনকারী সংস্থা মিলে ডিমের মূল্য নির্ধারন করে দিবেন।

২২। পোল্ট্রি শিল্পের খাদ্যের কাঁচামাল যেমন ভূট্টা,সয়াবিন, রাইস পলিশ, প্রোটিন কনসেনট্রেট, ভিটামিন ও মিনারেলস সহ সকল প্রকার ভ্যাকসিন ও মেডিসিন সমূহের উপর থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করতে হবে।

২৩। পোল্ট্রি খাদ্যের মূল্য নির্ধারনে একটি কার্য্যকর নীতিমালা করতে হবে, দেখা যায় খাদ্যের কাচামালের দাম বাড়লে খাদ্যের দাম যেমন বাড়ে তেমনি কাঁচামালের দাম কমলে খাদ্যের দামও কমবে কিন্তু ফিডমিল মালিকরা আর কমাতে চান না বা কমান না। এই ব্যাপারেও সরকারের একটা কঠোর অবস্থান গ্রহন করতে হবে।

২৪। সর্বশেষে যারা দাবি করেন পোল্ট্রি শিল্পের যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে তা সম্পুর্ন বেসরকারি ভাবেই হয়েছে, আমিও মানছি সে কথা। এটাকে তৈরী করতে যে তৎপরতা ছিল তার চেয়ে বেশী তৎপরতা দরকার ছিল এই শিল্পকে রক্ষা করার জন্য। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, যখন দেখতে পাই এই শিল্পের নেতৃত্বে যারা আছেন তারা সবাই মিলে দেশের এই বৃহৎ শিল্পটিকে রক্ষার্থে কার্য্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহন করলেন না, এ নিয়ে সংসদে একজন এমপি বা মন্ত্রি দিয়ে কোন বিবৃতিও দিতে পারলেন না, জাতীয় ইস্যু হিসেবে এটাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে আনতে পারলেন না অথবা কোন চেষ্টাও দেখলাম না। বরং শুনতে পাই আপনারা আপনাদের ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করছেন, এই শিল্প থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে আপনারা এখন অন্য সেক্টরে বিনিয়োগ করছেন। আমি কারও নাম উল্লেখ করে বলতে চাই না, মানুষ কিছুদিনের মধ্যেই আপনাদের সম্পর্কে জানতে পারবে, বুঝতে পারবে। আজকে কাজি, প্যারাগন, আফতাব, নারিশ, ফিনিক্স, কোয়ালিটি, আগাসহ প্রত্যেকেই একাই পারেন এক একটা বিশ্বমানের ল্যাব ও গবেষনাগার তৈরী করে দিতে এবং সেখানে আমাদের দেশের তরুন বিজ্ঞানীরা গবেষনার মাধ্যমে নতুন উদ্ভাবনী দ্বারা এই সেক্টরকেই এগিয়ে নিতে পারবে। আমি আরও লক্ষ্য করছি, বড় বড় হ্যাচারীগুলোতে বেশ কিছু বিদেশী কনসালটেন্ট আছেন যাদের ডিগ্রি ও কাজের সাথে কোন মিল নেই অথচ তাদের অধিনেই আমাদের দেশের প্রাণি চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধেই কাজ করে যাচ্ছেন। আর এই সব তথাকথিত বিদেশী কনসালটেন্ট দ্বারাই আমাদের বেশী ক্ষতি হচ্ছে। তারা কখনও আমাদের দেশের তৈরী অত্যন্ত ভাল ভ্যাকসিন ও মেডিসিন সাপোর্ট করে না। তারা সবসময়ই বিদেশী ফরমুলা ও ভ্যাকসিন চাপিয়ে দিয়ে আমাদেরকে পঙ্গু করে রেখেছেন। পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এখানে আমি একটা উদাহরন দিতে চাই… আই এল টি রোগটি আমাদের দেশে ছিলনা, ২০০৬ সালে যখন আমাদের দেশে গ্র্যান্ড প্যারেন্ট মুরগি পালন শুরু হয় তখন এই লাইভ ভ্যাকসিনটি  ঐ সময়ের বিদেশী কনসালটেন্টের তৈরী ভ্যাকসিনের তালিকায় ছিল। আমরা সেদিন না বুঝেই ভ্যাকসিনটি করেছিলাম।  এভাবেই  আমাদের দেশে এই রোগটি আমদানি করা হয়। এখন  আমরা এটাকে দ্বিতীয় মারাত্নক রোগ হিসেবে বিবেচনা করছি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও হাইজিন বিভাগের শিক্ষকদের তত্বাবধানে আমার এবং ডাঃ মোঃ শফিকুল ইসলামের  দুটি এম.এস. থিসিস আছে  যাতে আই এল টি রোগটি বাংলাদেশে কি অবস্থায় আছে তার বিস্তারিত দেয়া আছে এবং এ বিষয়ে গবেষনা অব্যাহত আছে। তাই আমরা প্রয়োজনে বিদেশী ভাল কনসালটেন্টদের কাছে পরামর্শ করবো ঠিকই কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবার আগে অবশ্যই আমাদের দেশের অবস্থানকেই প্রাধান্য দেব।তাই আজকে আপনাদের কাছে আমার আকুল আবেদন, এই শিল্পের সুসময়ে থেকে যেমন এদেশের মানুষের কল্যানে কাজ করেছেন, প্রায় কোটি লোকের কর্মসংস্থানের পথ দেখিয়েছেন, দেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা মিটিয়েছেন, আজকের  এই দুঃসময়েই জাতির জন্য কল্যানকর কিছু করে যান, সাময়ীক বিপদকে দীর্ঘস্থায়ী মনে করে অন্যত্র বিনিয়োগ করে বিদেশীদের হাতে ফাকা মাঠ ছেড়ে দেবেন না। আমরা আজীবন আপনাদের সেবা করে যাব, মনে রাখবো, জাতি মনে রাখবে, দেশ উপকৃত হবে।

===

 

লেখকঃ ডাঃ মোহাম্মদ সরোয়ার জাহান

তিনি ডি.ভি.এম ও এম.এস. ইন মাইক্রোবায়োলজি ডিগ্রী অর্জন করেছেন বাকৃবি, ময়মনসিংহ থেকে। বর্তমানে টেকনিক্যাল ম্যানেজার হিসেবে ফিনিক্স হ্যাচারী লিমিটেড-এ কর্মরত। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ সোসাইটি ফর ভেটেরিনারি মাইক্রোবায়োলজি এণ্ড পাবলিক হেল্থ-এর আজীবন সদস্য। যোগাযোগঃ ০১৭১১৬১৮৫৯৩,০১৯১৬২০৩২৪৬, dr.sorwar@yahoo.com

এটাও দেখতে পারেন

জাতীয় স্বার্থে পোল্ট্রি শিল্পের জন্য কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবী

বড় দুঃসময় পার করছি আমরা যারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খামার মালিক, ফিডমিল মালিক, হ্যাচারী মালিক, মেডিসিন …

৭ মন্তব্য

  1. Thank you, Sir for your valuable information.Very very nice post.

  2. bhaijan, many many thanx. i m very much delighted after reading your article (all 3 part). it unveiled the hidden truth of this sector. think it will make us (vet professionals and its allied) more responsive and i hope we will be awakened. really i found the write up of u’r article clear, transparent and time testing. pls go ahead.

  3. Thanks for nice presentation.

  4. সারোয়ার প্রথমে তোমার প্রতি শুভেচ্ছা রইল । খুব ভাল হয়েছে, পরের লেখার অপেক্ষায় রইলাম ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *