নীড় / পোল্ট্রী / লাইভ বার্ড মার্কেট দরকার নেইঃ মুরগি (ড্রেসড মুরগি) বিক্রয় হবে দোকানে দোকানে।

লাইভ বার্ড মার্কেট দরকার নেইঃ মুরগি (ড্রেসড মুরগি) বিক্রয় হবে দোকানে দোকানে।

বাংলাদেশে মুরগি পালন ও বিক্রয়ের ঐতিহ্যঃ বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মুরগি পালনের ইতিহাস প্রায় দু’দশকের।এক সময় শুধু দেশি মুরগিই পালন করা হতো। প্রতিটি কৃষক পরিবারে হাঁস-মুরগি,গরু,ছাগল পালন ছিল পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। হাঁস-মুরগি,গরু,ছাগল পালন করা হলেও সংসারের জমা-খরচে তার আর্থিক মূল্য হিসাব করা হতো না।ধীরে ধীরে এগুলো সংসারে অর্থমূল্যে পরিনত হয় এবং সংসারের একটি বাড়তি আয়ের উৎস হিসাবে পরিগণিত হতে থাকে এবং মানুষ পদ্ধতিগত ভাবে লালন-পালন শুরু করে। কৃষক বাড়ির মহিলারাই সাধারনতঃ এই সব হাঁস-মুরগি পালন করতেন। পালনকৃত মুরগির মাংশ ও ডিমদ্বারা অধিকাংশ কৃষকরাই শুধু তাদের নিজেদের প্রয়োজন মেটাতেন। কেবল সমাজের অতিদরিদ্র শ্রেণির মানুষ তাদের পালনকৃত মুরগি গ্রামের হাটে-বাজারে বিক্রয় করতেন। সমাজের আরেক শ্রেণির মানুষ কেউ গ্রামে ঘুরে ঘুরে ফেরিওয়ারাদের মতো মাথায় বা সাইকেলে বড় বাঁশের ঝুরিতে করে মুরগি ক্রয় করতেন এবং সেগুলো গ্রামের হাটে বিক্রয় আবার কেউ শহরের বাজারে বিক্রয়ের জন্য নিয়ে যেতেন। সে সময়ে দেশির মুরগির প্রাচুর্য ছিল। ৮০-৯০ এর দশকে আমাদের দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মুরগি পালন শুরু হয় এবং নব্বই এর দশকে ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়। দেশি মুরগির বিদ্যমান বাজারে যোগ হয় বাণিজ্যিক লেয়ার,ব্রয়লার,সোনালী ও ফাওমির মতো উন্নত বাণিজ্যিক জাতের মুরগি পালন ও বিপণন। এবং কেজিতে মুরগি বিক্রয় শুরু হয়।

বর্তমান বাজার ব্যবস্থাঃ বর্তমানের বাজার ব্যবস্থা আমাদের চিরায়ত ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। শহরের বাজারে মুরগি বিক্রয়কারীগণ সকলেই ব্যবসায়ী। তারা বিভিন্ন খামার থেকে বাণিজ্যিক জাতের মুরগি এবং কৃষকের বাড়ি হতে দেশি মুরগি ক্রয় করে বাজারে এনে বিক্রয় করে থাকেন। এবং গ্রামের বাজারে ব্যাপারী এবং কৃষক উভয়েই মুরগি বিক্রয় করে থাকেন। গ্রামের বাজারে শতভাগ মুরগিই জীবন্ত ক্রয়-বিক্রয় হয়।এবং শহরের বাজারে প্রায় ৮০ ভাগ মুরগি জীবন্ত বিক্রয় হয়। আগে গ্রামে সাধারণতঃ সপ্তাহের নিদিষ্ট দিনে হাট বসতো এবং সন্ধ্যার পর ভেঙ্গে যেত। হাটের এক কোনে বসতো মুরগির বাজার। বর্তমান সময়ে গ্রামের প্রতিটি বাজারে হাট দিন ছাড়াও স্থায়ী ভাবে অন্যন্য পণ্যের মতো মুরগি বিক্রয় হয়। এমনকি বাজার ছাড়াও গ্রাম ও শহরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে,রাস্তার পাশে মুরগি বিক্রয় হয়। বাংলাদেশের শহর-গ্রাম সকল বাজারে দু’ভাবে মুরগি বিক্রয় করা হয়ে থাকে (১) জীবন্ত মুরগি গ্রাহক, ব্যাপরী/কৃষকদের নিকট থেকে ক্রয় করে বাড়িতে নিয়ে জবাই করেন অথবা (২) জীবন্ত মুরগি কিনে বাজারেই জবাই করে ড্রেসিং করে বাড়ি নিয়ে যান। তবে বড় বড় শহরের সুপার মার্কেট ও কিছু ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোরে ড্রেসড মুরগি বিক্রয় করা হয়।

খাদ্য নিরাপত্তা (food safety and quality)ঃ গত এক দশক থেকে বাংলাদেশে ভোক্তা পর্যায়ে মুরগি এবং মুরগিজাত পণ্যের চাহিদা ব্যপক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং food safety and quality বিবেচনায় এই খাদ্য পণ্যের বিশ্ববাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে মুরগি জবাই, ড্রেসিং এবং বিপনণের জন্য সুনিদিষ্ট কোন নীতিমালা নেই। এই কারনে শহরে,নগরে,গ্রামে-গঞ্জে সর্বত্র রাস্তার পাশে,যেখানে সেখানে খুবই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মুরগি জবাই হচ্ছে,ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে।এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কোন আধুনিক পোল্ট্রি প্রসেসিং প্ল্যান্ট গড়ে উঠেনি, অধিকাংশ গ্রাহক কে রাস্তার পাশের দোকান এবং ছোট ছোট খুচরা বিক্রেতাদের নিকট থেকে নিজের উপস্থিতিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জবাইকৃত মুরগি ক্রয় করতে হচ্ছে। বর্তমান সময়ে মানুষ অনেক স্বাস্থ্য সচেতন তাই খাদ্যপুষ্টি এবং খাদ্যের হাইজিনিক অবস্থা সম্পর্কে বেশি সজাগ।এ কারনে মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যপণ্য পেতে ব্যকুল।এমতবস্থায় food safety and quality’র কথা বিবেচনায় ড্রেসড মুরগি বা প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্যরে চাহদিা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছ।

ভোক্তার পছন্দ (consumer demand)ঃ বাজার অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার আলোকে একজনউৎপাদনকারীকে ভোক্তার পছন্দ, চাহিদা ও চাহিদা বৃদ্ধির বিষয় বিবেচনায় রেখে পণ্য উৎপাদন করতে হয় এবং বাজারে এর যোগান বাড়াতে হয়।সময়ের পরিক্রমায় সমাজে একটি আধুনিক শ্রেণির মানুষের উন্মেষ ঘটেছে। এইসব কর্মব্যস্ত ও আধুনিক শহুরে মানুষদের কাছেবিভিন্ন ব্র্যান্ডেড পণ্য ক্রয় করা সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে। আধুনিক প্রসেসিং পস্নান্টে ড্রেসিং করা মুরগির মাংশ এবং মুরগিজাত পন্য (ready to cook) ক্রয় করা এদের কাছে প্রথম পছন্দ। মানুষের খাদ্যভাস পরিবর্তন ও ব্যস্ততার কারনে প্যাকেজিং ফুডের চাহিদা বাড়ছে। যে মাংশের প্যাকেটে মাংশের সকল properties সম্বলিত লেবেল লাগানো থাকবে তার চাহিদা অন্য সাধারণ মাংশের চেয়ে বেশি হবে।


পোল্ট্রি শিল্পের নিরাপত্তা বিধানঃ ২০০৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রার্দুভাব ঘটে। পরবর্তী কয়েক বছর ব্যপক বিপর্যয় ঘটে। এরপর এই রোগ ব্যবস্থাপনায় বহুমুখী ব্যবস্থা গৃহিত হওয়ার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ এবং ব্যবস্থাপনায় আমাদের সক্ষমতাও বেড়ে বিপর্যয় কিছু কমলেও এ বিষয়ে এক আতঙ্ক সর্বদা তাড়া করে ফিরছে। আমাদের দেশে মুরগি খামার স্থাপন,ব্যবস্থাপনা ও মুরগি চলাচল অনেকাংশেই নিয়মের মধ্যে হয় না বিধায় বিভিন্ন ভাবে রোগ বিস্তার ঘটে। জীবন্ত মুরগির বাজার মুরগির রোগ বিস্তারের একটি অন্যতম মাধ্যম। মুরগির মাধ্যমে শুধু মুরগিরই রোগ হয় না। অনেক রোগ আছে যা এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতিতে সংক্রমণ ঘটায়। এ ধরনের রোগকে বলা “জুনোটিক” রোগ। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ধরনের একটি রোগ যা মুরগি থেকে মানুষে বিস্তার লাভ করে। যদি জীবন্ত মুরগি বিক্রয় বন্ধ করা যায় তাহলে মুরগির রোগ বিস্তারের ঝুকি ৮০ ভাগ কমে যাবে।চীনের চার শহরে এই বছরের প্রথম দিকে H7N9 এর প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং মানুষ আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির বয়স,লিঙ্গ,অবস্থান,বাসস্থান এবং রোগ শুরুর প্রথম দিন থেকে সকল তথ্য সংগ্রহ করে গবেষকরা H7N9 দ্বারা আক্রানেত্মর বিষয়টি নিশ্চিত হন। গবেষকরা যে সকল এলাকায় রোগ সংক্রমণের ঝুকি রয়েছে সে এলাকার লাইভ পোল্ট্রি মার্কেট বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ করেন। আরেক গবেষণায় বলা হয়েছে যে মানুষে সংক্রমণের জন্য এই রোগের স্থায়ী উৎস হলো মুরগি বাজার এজন্য বাজার ও বাজার সংশিস্নষ্ট এলাকা,যানবাহন এবং ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি প্রতিদিন জীবাণুমুক্তকরনের সুপারিশ করা হয়।২০১৩ সালের এপ্রিল মাসের শুরুতে Shanghai, Hangzhou, Huzuo and Nanjing এর ৭৮০টি লাইভ পোল্ট্রি মার্কেট বন্ধ করে দেয়া হয়। যে কোন রোগ বিস্তারের জন্য মাধ্যম দরকার হয়। কোন একটি প্রাজাতিতে কোন রোগ বিস্তারের জন্য সবচেয়ে সহজতম মাধ্যম হলো ঐ প্রাজাতির অন্য সদস্য। মুরগির রোগ বিস্তারের জন্য অন্যতম প্রধান ও সহজ মাধ্যম হলো মুরগি। জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভেবে আমাদের জীবন্ত মুরগি বিক্রয় বন্ধ করে ড্রেসড মুরগি বিক্রয়ের ব্যাবস্থা করা হলে মুরগি খামারও রোগ বালাই মুক্ত থাকবে।
নতুন ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টিঃড্রেসড মুরগি ক্রয়-বিক্রয় শুরু হলে প্যাকেজিং খাতে নতুন কিছু কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। সুদৃশ্য প্যাকেট গায়ে মুরগির মাংশের কোয়ালিটি এবং হাইজিনিক অবস্থা ইত্যাদি লিপিবদ্ধ থাকবে,ফলে এমন মাংশের চাহিদা উত্তোত্তর বৃদ্ধি পাবে এবং প্যাকেজিংসহ এই খাতে কিছু নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।বাংলাদেশে উৎপন্ন উন্নতমানের অনেক কৃষি পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানিতে এদেশের সুনাম আর ঐতিহ্য রয়েছে। যেমন পাট ,চা, চামড়া,চিংড়ি। পোল্ট্রি বর্তমানে বাংলাদেশে একটি কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়িত রয়েছে যা আমদের পোশাক শিল্পের চেয়ে কম নয়। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় ডিম ও মাংশের যতেষ্ঠ ঘাটতি রয়েছে।প্রতিদিন আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় ১২০ গ্রাম মাংশের পরিবর্তে পাচ্ছি ২১ গ্রাম,বছরে ১০৪ টি ডিমের অনুকুলে পাচ্ছি ৪১ টি ডিম। সুতরাং ১৫ কোটি মানুষের প্রয়োজনীয়তা পূরনের কর্মসূচীই যদি আমরা গ্রহন করি তাহলে এই খাতে বৈপস্নবিক পরিবর্তন সাধিত হবে এবং একটি কর্মক্ষম মেধাবী জাতি গঠনে আমাদের যাত্রা তরান্বিত হবে। ১৫ কোটিমানুষের এই দেশে বিপুল সংখ্যক কর্মহীন মানুষের আরো কিছু অংশকে এই শিল্পে নিয়োজিত করে চিংড়ির মতো পোল্ট্রিজাত পণ্য রপ্তানি করা যেতে পারে।তথ্য প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভুত উন্নয়নের ফলে সারা দুনিয়া এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। কোথায় কি পাওয়া যায় তা মানুষ এখন মুহুর্তের মধ্যে জানতে পারে। তাছাড়া মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে আমরা কোয়ালিটি পণ্য উৎপন্ন করতে পারলে যে কোন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারি।

আমাদের প্রবণতাঃ
আগে সকল বাজারে জীবন্ত মুরগি ওজন ছাড়া বিক্রয় হতো। ওজন কত হতে পারে ক্রয়-বিক্রয়কারী নিজেদের অনুমানের উপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণ করতেন। এখনো গ্রামের বাজারে কোথাও কোথাও এই ব্যবস্থা প্রচলিত আছে।তবে বাংলাদেশের কোন শহরের বাজারে এই ধরনের ক্রয় -বিক্রয়ের কথা এখন আর শোনা যায় না। শহর কেন্দ্রিক প্রায় সকল বাজারে এখন হাঁস-মুরগি ওজনে বিক্রয় হয়।এই কথা বা বক্তব্যটি আজকের লেখার সাথে প্রাসঙ্গিক নয়,এ বক্তব্য দ্বারা আমাদের দেশের মানুয়ের প্রবণতা কথা বুঝানো চাওয়া হয়েছে।অর্থাৎ আমাদের প্রবণতা হলো কোন কাজ একবার শুরু হলে তা সম্প্রসারিত হবে ধীরে ধীরে সফলতা আসবে। যেহেতু এটা একটা এসেন্সিয়াল প্রোডাক্ট তাই এ ধরনের পণ্যের ব্যবসা একবার শুরু হলে আর বন্ধ হবে না। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা গেছে যে জীবন্ত মুরগি বিক্রয়ের বাজার থেকে মুরগির অধিকাংশ রোগের কারন এবং এখান থেকে দ্রুত বিভিন্ন স্থানে বিস্তার ঘটে। তাই আমরা যদি আমাদের সম্ভাবনাময় ও বিকাশমান পোল্ট্রি শিল্পকে positively এগিয়ে নিতে চায় এবং খাদ্য নিরাপত্তার (food safety) কথা বিবেচনা বা চিন্তা করি তাহলে ড্রেসড পোলিট্র বিক্রয়ের বিষটিকে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। পৃথিবীর বহু দেশে জীবন্ত মুরগি ক্রয়-বিক্রয় সীমিত করে ড্রেসড বা ফ্রজেন পোল্ট্রি বিক্রয়ের উপর জোর দেয়া হয়েছে এমনকি অনেক দেশে জীবন্ত মুরগি বিক্রয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

সমস্যা ও সম্ভাবনাঃ আমাদের দেশে শতকার ৮০ ভাগই হলো স্বল্প পুঁজির ছোট ছোট খামারী। ২০০/৫০০ মুরগি পালন করে তা ড্রেসিং করে বা প্যাকেটজাত করে বিক্রয় করা সম্ভব না।আমাদের দেশে মুরগি পালনকারী (উৎপাদনকারী) এবং বিক্রয়কারী সম্পূর্ন আলাদা বিষয়। অর্থাৎ খামারী বা পালনকারী মুরগি বাজারজাত উপযোগি করে তৈরি করে এবং মুরগির ব্যাপারী বা ব্যবসায়ী খামারীদের নিকট থেকে ক্রয় করে ভোক্তার নিকট বিক্রয় করে থাকে। আবার সরাসরি ভোক্তার নিকট যারা মুরগি পৌছায় সেই ব্যাপরীরা ছোট খামারীদের চেয়ে আরো ক্ষুদ্র পুঁজির মালিক। সুতরাং এইসব ছোট খামারী এবং মুরগি ব্যবসায়ীদের একার পড়্গে প্রসেসিং প্লান্ট স্থাপন করা সম্ভব নয়। ছোট খামারীগণ সমবায় ভিত্তিতে প্রসেসিং পস্নান্টস্থাপন করে মুরগি ড্রেসিং ,প্যাকেজিং করতে পারে। যেহেতু জীবন্ত মুরগির বাজার মুরগি বিভিন্ন রোগের উৎস এবং মানুষের বার্ডফ্লু’র মতো রোগের সংক্রমণ ঘটায় সে ড়্গেত্রে মুরগি ড্রেসিং এবং প্যাকেজিং শুরু হলে জীবন্ত মুরগির বাজার আর দরকার হবে না। অন্যান্য পণ্যের মতো প্রসেসিং করা মুরগি বাজারের যে কোন দোকানে বিক্রয় হতে পারে।বাজার ব্যবস্থায় আধুনিকায়নের কারনে আমাদের দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাজারে যেখানে বিদ্যুৎ সুবিধা আছে সেখানকার দোকানে ফ্রিজ আছে। সুতরাং মুরগির মাংশ বিক্রয়ের জন্য আর নিদিষ্ট বার্ড মার্কেট বা মুরগি বাজারের দরকার হবে না। শুধু দরকার হবে প্রসেসিং পস্নান্ট।মুরগি প্রসসিং করে বাজারের দোকানে দোকানে সরবরাহ করতে হবে বা দোকানী সংগ্রহ করবে।বর্তমানে মানুষের আয় বেড়েছে সেই সাথে মাংশ এবং পোল্ট্রিজাত পণ্যের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। মানুষের জীবনযাত্রার মানবৃদ্ধির সাথে সাথে খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এসেছে এবং খুবই সহজলভ্য, সাশ্রয়ী,সহজপাচ্য ও উৎকৃষ্টমানের প্রোটিন হওয়ায় আমাদের দেশের বিরাট মধ্যবৃত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে মুরগির মাংশের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে পোল্ট্রি প্রসেসিং কার্যক্রমকে এগিয়ে নেয়া সহজ হবে।

ড্রেসিং করা মুরগি বিক্রয়ের বহুবিধ সমস্যা রয়েছে। আমাদের দেশে মুরগি(মুরগির মাংশ) বিক্রয়ের জন্য সুসংগঠিত কোন বাজার নেই। স্থায়ী অস্থায়ী বাজারের পাশাপাশি ফুটপথের দোকানে পর্যন্ত মুরগি বিক্রয় হয়। তাই ড্রেসিং করে মুরগি বিক্রয় করা সবার পড়্গে সম্ভব নয় তবে ড্রেসিং করা মুরগি সংরক্ষণ করে বিক্রয় করা সহজ হবে। বর্তমানে আমাদের দেশের বড় বড় শহরের দু’একটি সুপার মার্কেটে বা ডেপার্টমেন্টাল ষ্টোরে বিক্রয় করা হয়ে থাকে। ক্ষুদ্র খামারী ও ব্যাপরীদের পক্ষ্যে ড্রেসিং করে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। মুরগি ব্যাপারীদের ঐ ধরনের বড় পুঁজি বিনিয়োগ করার সামর্থ্য নেই। যদি ড্রেসিং ছাড়া মুরগি বিক্রয় নিষেধ করা হয় তাহলো বড় পুঁজির মালিকদের কাছে এ ব্যবসা চলে যাবে। তবে জীবন্ত মুরগি বিক্রয়ের পর ড্রেসিং ছাড়া বাজার থেকে বের না করার ব্যাপারে কড়া কড়ি বা বাধ্যবাধকতা তৈরি করা যেতে পারে।
সময় সচেতন,কর্মব্যস্ত ভোক্তা যেমন প্রসেস করা মুরগির মাংশ পছন্দ করেন,তেমনি আরেক শ্রেণির ভোক্তা আছে যাদের পছন্দ বাজারের এক কোনে জবাই হওয়া ফ্রেস মাংশ। বাংলাদেশের মানুষ মূল্য সচেতনও বটে। বিভিন্ন কারনে প্রসেস করা মুরগির মাংশের দাম কিছুটা বেশি তাই তারা Processed chicken এর চেয়ে wet-market dressed chicken পছন্দ করে। তাছাড়া আমাদের অধিকাংশ ক্রেতার এখনো বদ্ধমূল ধারনা যে জীবন্ত ও wet-market dressed মুরগির মাংশ ফ্রেস এবং প্রসেস করা মুরগির মাংশ ফ্রেস না বা পুরাতন।
সংরক্ষণ করে রাখা ড্রেসড মুরগি বিক্রয়ের ব্যাপারে বিক্রেতার সততার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমান অধ্যুষিত দেশ হওয়ার কারনে মুরগি হালাল পদ্ধতিতে জবাই করতে হবে। ক্রেতা যদি এ বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত না হন তাহলে সহজে ড্রেসড মুরগি ক্রয় করবে না। তাছাড়া ড্রেসড মুরগি সুস্থ ছিল কি না এ বিষয়টি ও সমধিক গুরুত্ববহ। সুস্থ মুরগি ড্রেসিং করা হয়েছে এ মর্মে ভেটেরিনারী কর্মকর্তার সার্টিফকেট বা সুস্থতার সনদ থাকা প্রয়োজন এবং ড্রেসিং করা মুরগির প্যাকেটের গায়ে মুরগির জাত,বয়স,পালন পদ্ধতি,প্যাকেজিং এর তারিখ,মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ ইত্যাদি লেখা থাকতে হবে।
যে কারনে ড্রেসড বা প্রসেসড মুরগি বিক্রয় করতে হবেঃ আমাদের দেশের (live poultry market) বাজার ব্যবস্থাপনা (হাইজিনিক দৃষ্টিকোন থেকে) খুবই নাজুক। অনেক গ্রাহক মুরগি ক্রয়ের পর ড্রেসিং করে নিতে চান সে ড়্গেত্রে ব্যাপারী বা মুরগি ব্যবসায়ীরা মুরগি ড্রেসিং এরপর মুরগি পালক,নাড়িভুড়ি ড্রেন,নর্দমা বা যে যার মতো ইচ্ছে ফেলে দেন। বাংলাদেশের শতকরা ৯৯ ভাগ বাজারে মুরগির ড্রেসিং এর পর পালক,নাড়িভুড়ি বা এই ধরনের আর্বজনা ফেলার কােন নিদিষ্ট জায়গা নাই। বাজারের কোন এককোনে ফেলে রাখা হয়। সপ্তাহ বা মাসাধিক পড়ে থাকার পর সরানো হয়। এর আগে কুকুর,বিড়াল, কাক,চিল বা এই জাতীয় পশু-পাখি ঐস্থান থেকে মুখে করে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ফেলে চারেদিকে রোগ ছড়ায়। মুরগি বাজারে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা ও বজায় রাখার জন্য প্রতিটি বাজারে মুরগিজাত বজ্য ফেলার জন্য ঢাকনাযুক্ত পিট থাকা আবশ্যক।বিভিন্ন খামার বা বাড়ি হতে মুরগি ব্যবসায়ীরা মুরগি ক্রয় করে বিক্রয়ের জন্য বাজারে নিয়ে আসেন। এর ফলে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের রোগও বয়ে নিয়ে আসেন। কোন খামার থেকে কেউ সুস্থ মুরগি নিয়ে আসলেও বাজারে এসে আক্রান্ত হতে পারে। মুরগি দেহে রোগের জীবাণু প্রবেশের পর সাথে সাথে রোগের লক্ষণ প্রকাশ না ও পেতে পারে,সেড়্গেত্রে আপত দৃষ্টিতে কোন মুরগি সুস্থ মনে হলেও সে মুরগি হতে বা মুরগির পালক,নাড়িভুড়ি হতে রোগের বিস্তার ঘটে থাকে। এ জন্য মুরগি যদি ড্রেসিং করে নেয়া হয় সেড়্গেত্রে রোগ বিস্তারের সম্ভাবনা কম থাকে। আমরা বাজার থেকে মুরগি কিনে হাতে,ব্যাগে ভরে রোগ ছড়াতে বাড়ি নিয়ে যায়। আবার বাড়ি যেয়ে জবাইয়ের পর পালক,নাড়িভুড়ি বাড়ির পাশে আবর্জনার স্তুপে ফেলে দেয়া হয়। সেখান থেকে কুকুর,বিড়াল,শেয়াল এই আবর্জনা অন্যত্র বয়ে নিয়ে যায়। এর ফলে পরিবেশ দূষিত হয় এবং রোগ বালাই বিস্তার ঘটে। অসুস্থ মুরগি থেকে মানুষের রোগ হতে পারে এ বোধ বা সচেতনা থেকে আমরা যদি মুরগি জবাইয়ের পর এর পালক এবং নাড়িভূড়ি গর্ত করে পুতে রাখি তাহলে মানুষ এবং আপনার প্রতিবেশির মুরগি খামার এমন কি আপনার বাড়িতে আপনার খুব প্রিয়,সখের যে কবুতর বা মুরগি প্রতিদিন একটি করে ডিম দিচ্ছে তারাও নিরাপদ থাকে।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প (poultry-meat industry) একটি দ্রুত বর্ধিষ্ণু খাতযা ক্রমান্বয়ে অসংগঠিত,ক্ষুদ্র (small-scale) এবং পারিবারিক পর্যায় থেকে সুসংগঠিত,বৃহত্তর পরিসরে বাণিজ্যিক পর্যায়ে উপনিত হয়েছে। কৃষির অন্যন্য উপ-খাতের মধ্যে পোল্ট্রি শিল্প একটি অন্যতম দ্রুত বর্ধমান উপ-খাত। এই খাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য অনেকগুলো key factor জড়িত| এর মধ্যে প্রথম ও প্রধান হলো ভোক্তার চাহিদা বৃদ্ধি। মানুষের আয় বৃদ্ধি এবং অন্যান্য পণ্যের তুলনায় মুরগির মাংশের দামের বিষয়টি ক্রেতার পছন্দ কে প্রভাবিত করে।দ্বিতীয় যে বিষয়টি আমাদের পোল্ট্রি খাতকে আরো দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে তা হলো বাজার কাঠামোর পরিবর্তন। যদিও বাজার ব্যবস্থা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে প্রায় সব ড়্গেত্রে জীবন্ত মুরগির অনুমানিক ওজন ধরে ক্রয়-বিক্রয় হতো। এরপর মুরগি ওজনে বিক্রয় শুরু হয়। তারপর বাজারেই জবাই করে ড্রেসিং করে বিক্রয় শুরু হয় এবং এটা দেশের প্রায় সব অংশে শুরু হয়েছে। আমরা আশা করি নিকট ভবিষ্যতে প্রসেসিং করা মুরগি (chilled or frozen) আমাদের বাজারেও সহজলভ্য (available) হবে। এভাবে পোল্ট্রি শিল্প স্থিতিশীলতা লাভ করবে এবং মানুষের স্থিতিশীল অংশ গ্রহন বাড়বে, poultry-meat-এর বহুমুখী ব্যবহার শুরু হবে, এবং আমাদের poultry industry রপ্তানিমুখী হবে।
মোঃ মহির উদ্দীন।
সুত্রঃ ইন্টারনেট।

লেখকঃ মোঃ মহির উদ্দীন

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ঈশ্বরদী, পাবনা। মোবাইলঃ ০১৭১৬১৭২৯৫৭ ইমেইলঃ uloish2011@gmail.com

এটাও দেখতে পারেন

সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি শিল্পঃনিয়ন্ত্রনহীন বাজার ব্যবস্থা

মাহ্ফুজুর রহমান বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার একটি দেশ। পোল্ট্রি শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান, ধারাবাহিক উন্নতি নিঃস্বন্দেহে গৌরবের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *