মুরগির শরীরে পালক থাকা না থাকার গুরুত্ব, কারন ও প্রতিকার

অনেক সময় দেখা যায় মুরগির শরীরে পালক গজায় না বা যে পরিমান পালক থাকা দরকার সে পরিমান পালক থাকে না। আবার কখনো মুরগি নিজেই নিজের বা এক মুরগি অন্য মুরগির পালক তুলে ফেলে। এছাড়া আরো অন্যান্য কারনে বিভিন্ন সময়ে শরীর থেকে পালক উঠে যায়। মুরগির শরীরে পালক থাকা না থাকা আপতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে তেমন গুরুত্ববহ মনে হয় না। কিন্তু এ বিষয়টি মুরগির উৎপাদন,স্বাস্থ্যগত অবস্থা (health stats),খাদ্য গ্রহন,খামার ব্যবস্থাপনা, সর্বপরি মুরগির বাজার মূল্যকে প্রভৃতিকে প্রভাবিত করে।

মুরগির শরীরে পালক থাকা না থাকার গুরুত্ব ঃ পালক মুরগি একটি উৎপাদন বৈশিষ্ট্য (production trait)। যদি মুরগির দেহে ভালোভাবে পালক না গজায় বা কোন কারনে পালক উঠে যায় তাহলে এই অবস্থা মুরগির performanceএর উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মুরগির খাদ্য গ্রহন এবং শরীরে পালকের উপস্থিতি পরস্পর সহসম্বন্ধযুক্ত। যে মুরগির দেহে পালকের অবস্থা খারাপ(poor feather) সে মুরগি ভালো পালকযুক্ত মুরগির চেয়ে ১৬% বেশি খাদ্য গ্রহন করে থাকে। অন্যদিকে ভালো পালকযুক্ত মুরগি খারাপ পালকযুক্ত মুরগির চেয়ে বেশি ডিম উৎপাদন করে। মুরগির পালক মুরগিকে বাইরের আঘাতসহ বিভিন্ন ঘাত প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং তাপ,শৈত্য,বৃষ্টি প্রভৃতি থেকে রক্ষা করে অর্থাৎ ইনসুলেশনের কাজ করে। যদি মুরগির শরীরে পালক কম থাকে বা বিভিন্ন কারনে যদি পালক পড়ে যায়,উঠে যায় তাহলে মুরগির খাদ্য গ্রহন বেড়ে যায়। কারন দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রেণের জন্য এনার্জি ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। বেশি এনার্জি উৎপাদনের জন্য বেশি খাদ্যের দরকার হয় এবং এর ফলে খাদ্য গ্রহন বেড়ে যায়। এ অবস্থায় খাদ্য রুপান্তর হারের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে খাদ্য খরচ বেড়ে যায়। তাছাড়া মুরগির পালক না থাকলে ভোক্তার চাহিদা বা বাজার মূল্য ভালো হয় না।

ভালোভাবে পালক না গজানো বা শরীর থেকে পালক উঠে যাওয়ার কারন ঃ মুরগির দেহে পলক কম গজানো বা দেহ থেকে পালক উঠে যাওয়া বা পড়ে  যাওয়ার বহুবিধ কারন রয়েছে। পুষ্টি ঘাটতি, রোগ-বালাই, ত্রুটিপূর্ণ খামার ব্যবস্থাপনা,কৌলিতাত্তিক ও অভাসগত কারন উল্লেখযোগ্য। Naket neck বা গলাছিলা জাতের মুরগির গলায় কোন পালক গজায় না এটা ঐ জাতের মুরগির একটা বৈশিষ্ট্য। অনেক সময় দেখা যায় বাচ্চা অবস্থায় ভালোভাবে পালক গজাচ্ছেনা আবার কোন কোন সময় মুরগি mature হওয়ার পর মোল্টিং ছাড়াও আপনা আপনি শরীর থেকে পালক পড়ে। এ অবস্থার অন্যতম প্রধান কারন হলো খাদ্যে ক্রিটিক্যাল এমাইনো এসিডের ঘাটতি। মুরগির পালকে উচ্চ মাত্রাার মিথিওনিন থাকে। মিথিওমিন হলো সালফার সমৃদ্ধ একটি এমাইনো এসিড। আবার সালফার মুরগির পালকেরও অন্যতম একটি গাঠনিক উপাদান। যদি মুরগিকে সরবরাহকৃত খাদ্যে উল্লেখিত এমাইনো এসিডের ঘাটতি থাকে তাহলে মুরগির শরীরে ভালোভাবে পালক গজাবে না। ব্রিডিং খামারে মোরগ-মুরগি বার বার মিলনের ফলে মুরগির পিঠ ও গলার এবং মোরগের (breast area) বুকের পালক উঠে যায়। ব্রিডিং season শেষে এসব পালকবিহীন স্থানে আবার পালক গজায়। যদি মুরগির abdominal  ও vent area পালক না থাকে তাহলে বুঝতে হবে বহিঃ পরজীবী সংক্রমণের কারনে এমনটি ঘটতে পারে। এ ক্ষেত্রে পেষ্টিসাইড স্প্রে করে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আরো যে সকল কারনে পালক পড়ে যায় বা উঠে যায় তা হলো ঃ-

অপর্যাপ্ত পুষ্টি সরবরাহ ঃ মুরগির শরীরে পালক ভালো গজানো এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরবরাহকৃত খাদ্যে পর্যাপ্ত প্রোটিন,এমাইনো এসিড,ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান থাকা জরুরী। মুরগির বয়স,জাত এবং উপযোগিতা অনুসারে সূষম খাদ্য সরবরাহ করতে হবে যাতে মুরগি feather growth এবং maintenance এর জন্য প্রয়োজনীয পুষ্টি উপাদান গ্রহন করতে পারে। বিভিন্ন বয়সে মুরগির জন্য বিভিন্ন মাত্রায় প্রোটিন এবং এনার্জি সরবরাহের প্রয়োজন হয। যেমনঃ মাংশ উৎপাদনকারী মুরগি বিশেষ করে ব্রয়লারের জন্য জীবনের প্রথম দিকে সরবরাহকৃত খাদ্যে প্রোটিনের পরিমান বেশি দরকার হয়,কারন এসময় দ্রুত দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে। এই সময়কে বলা হয় fast growth period । বয়স বাড়ার সাথে সাথে দেহ রক্ষণাবেক্ষণ এবং feather growth এর জন্য কম পরিমান প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। আবার ডিম উৎপাদনকারী মুরগির জন্য মাংশ উৎপাদনকারী মুরগির তুলনায় প্রোটিন,এনার্জি এবং খনিজের প্রয়োজন ভিন্ন হয়।

পালক ঠোকরানো এবং তোলা ঃ পালক ঠোকরানো এবং তোলার কারনেও শরীরে পালক কমে যায়। পুষ্টি ঘাটতি বিশেষ করে প্রোটিন ঘাটতিজনিত কারনে পালক ঠোকরানো অভ্যাস গড়ে উঠে। পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য সরবরাহের পরও ফ্লকের কিছু মুরগির আগ্রাসি মনোভাবের কারনে feather loss হতে থাকে। পালক ঠোকরানো মুরগির natural নয় learned behavior। অর্থাৎ কোন ফ্লকের একটি বা কিছু মুরগি যদি এই বিষয়টি শুরু করে তাহলে অন্যান্য মুরগি তা দেখে অভ্যাসটি আত্ব্যস্থ করে বা শিখে এবং তা শুরু করে। কারন মুরগি খুবই কৌতুহলী পাখি হওয়ায় অন্য কোন মুরগির কৃত কোন বিষযের প্রতি তাদের মনোযোগ আকৃষ্ট হয় এবং অন্যরাও এটি শুরু করে। পালক ঠোকরানো যে কোন ছোঁয়াচে রোগের চেয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। পালক ঠোকরানো মুরগির একটি বদ অভ্যাস। যদি অল্প জায়গায় বেশি মুরগি রাখা হয়,খাদ্যে প্রোটিন বা খনিজ উপাদানের পরিমান কম থাকে তাহলে এটি হয়ে থাকে। এ কারনে ডিম উৎপাদন করে যায় এমনকি মুরগির মৃত্যুও হয়।

মোল্টিং ঃ মোল্টিং এর কারনে পালক পড়ে। মোল্টিং হলো মুরগির পালক বদলানোর একটি natural process। যখন দিনের দৈর্ঘ্য কম হয় তখন সাধারণতঃ মোল্টিং শুরু হয়। শীতকালে কৃত্রিম আলোক প্রদনের মাধ্যমে দিনের দৈর্ঘ্য প্রতিদিন ১৪ ঘন্টা পর্যন্ত বাড়িয়ে  বাণিজ্যিক লেয়ার মুরগির মোল্টিং এড়ানো হয়। কিন্তু নধপশুধৎফ মুরগির ক্ষেত্রে মোল্টিং একটি সাধারণ বিষয়। কারন দিনের দৈর্ঘ্য কম হলেও কৃত্রিমভাবে আলোক প্রদান করা যায় না। তাছাড়া দিনের আলোর উপস্থিতি সময়ে থাকে সময়ে থাকে না । মোল্টিং এর কারনে মুরগির পালক পড়ে যায় এবং নতুন পালক উঠে। মোল্টিং এর কারনে সাময়িক ডিম পাড়া কমে যায়।

রোগ এবং পীড়ন ঃ  রোগাক্রান্ত,স্বাস্থ্যহীন মুরগি অথবা যে মুরগি পীড়ন অবস্থায় থাকে সে সব মুরগির পালক পড়ে যেতে পারে,সুষ্ঠ খামার ব্যবস্থপনা এবং নিবীড় তত্তাবধানের মাধ্যমে এ অবস্থা পরিহার করা যায়। অত্যাধিক তাপমাত্রা,ঠান্ডা,রোগবালাই,অপর্যাপ্ত খাদ্য ও পানি সরবরাহ ইত্যাদি কারনে পীড়ন তেরি হতে পারে এবং এসব কারনগুলো মুরগির feather loss ও feather quality’র জন্য দায়ী। ভালো খামার ব্যবস্থাপনা সর্বদাই কাম্য এবং মুরগির পালক পড়া ও পালকের কোয়ালিটি ভালো খামার ব্যবস্থাপনা চাহিদার একটি নির্ণায়ক হতে পারে। যদি খামার পীড়নমুক্ত বা পীড়ন সহনশীল মাত্রায় রাখা যায়,মুরগিকে পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য এবং ভালো ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায় তাহলে strong feathers এবং  heathy flock পাওয়া যাবে। রোগের কারনে  feather follicle ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পালক উঠে যেতে পারে। মুরগির খামার লাভজনক হওয়ার জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ১) খাদ্য গ্রহন ২)  মুরগির শরীরে পালক পর্যাপ্ত না গজানো,পালক উঠে যাওয়া,পড়ে যাওয়ার সাথে মুরগির খাদ্য গ্রহন এবং উৎপাদন নিবীড়ভাবে জড়িত। সুতরাং উৎপাদন ধরে রাখতে পুষ্টি ও খামার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন জরুরী।

সহায়তা ঃ ইন্টারনেট।

লেখকঃ মোঃ মহির উদ্দীন

Avatar
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ঈশ্বরদী, পাবনা। মোবাইলঃ ০১৭১৬১৭২৯৫৭ ইমেইলঃ uloish2011@gmail.com

এটাও দেখতে পারেন

এগ্রোভেট ফার্মার উদ্যোগে খামারী প্রশিক্ষন কর্মশালা অনুষ্ঠিত

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই পোল্ট্রী , ডেইরী, ফিশারিজ শিল্প সম্প্রসারনের জন্য কাজ করে চলেছে এগ্রোভেট ফার্মা। শুধু …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.