নীড় / বিবিধ / অফ-টপিক / নবী (সঃ)-এর নামায আদায়ের পদ্ধতি

নবী (সঃ)-এর নামায আদায়ের পদ্ধতি

 

নবী (সঃ)-এর নামায আদায়ের পদ্ধতি
নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের নামায আদায়ের পদ্ধতি

*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*
মূল আরবীঃ
মহামান্য শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ্ বিন বায রাহিমাহুল্লাহ্
সাবেক প্রধান, ইসলামী গবেষণা, ইফতা, দাওয়াত ও এরশাদ বিভাগ
রিয়াদ, সৌদি আরব।
*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*
অনুবাদঃ আব্দুন্ নূর বিন আব্দুল জব্বারসম্পাদনাঃমোঃ জাকির হোসেন

*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*

الحمد لله وحده والصلاة والسلام على عبده ورسوله محمد وآله وصحبه.
যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ্ জন্য এবং দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর বান্দাহ্ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সাহাবাগণের প্রতি।আমি প্রত্যেক মুসলমান নারী ও পুরুষের উদ্দেশ্যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের নামায আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করতে ইচ্ছা করছি। এর উদ্দেশ্য হলো যে, যারা পুস্তিকাটি পাঠ করবেন তারা যেন প্রত্যেকেই নামায পড়ার বিষয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করতে পারেন। এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনঃ
((صَلُّوْا كَمَا رَأَيْتُمُوْنِيْ أُصَلِّيْ )) رواه البخاري
অর্থঃ ((তোমরা সেভাবে নামায আদায় কর, যে ভাবে আমাকে নামায আদায় করতে দেখ।)) [বুখারী] পাঠকের উদ্দেশ্যে (নিম্নে) তা বর্ণনা করা হলোঃ-

. সুন্দর পরিপূর্ণভাবে ওযু করবেঃ আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনে যেভাবে ওযু করার নির্দেশ প্রদান করেছেন সেভাবে ওযু করাই হলো পরিপূর্ণ ওযু। আল্লাহ্ সোবহানাহু ওয়াতা’আলা এ সম্পর্কে এরশাদ করেনঃ
(( يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُواْ إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فاغْسِلُواْ وُجُوْهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُواْ بِرُؤُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ )) [سورة المائدة: 6] অর্থঃ ((হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নামাযের উদ্দেশ্যে দণ্ডায়মান হও তখন (নামাযের পূর্বে) তোমাদের মুখমণ্ডল ধৌত কর এবং হাতগুলোকে কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও, আর মাথা মাসেহ কর এবং পাগুলোকে টাখনু পর্যন্ত ধুয়ে ফেল।)) [সূরা আল-মায়েদাহঃ ৬] নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনঃ
(( لاَ تُقْبَلُ صَلاَةٌ بِغِيْرِ طَهُوْرٍ وَلاَ صَدَقَةٌ مِنْ غُلُوْلٍ ))
অর্থঃ ((পবিত্রতা ব্যতীত নামায কবুল করা হয় না। আর খেয়ানতকারীর দান গ্রহণ করা হয় না।)) ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেনঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে নামাযে ভুল করার কারণে বললেনঃ
(( ِإذَا قُمْتَ إِلىَ الصَّلاَةِ فَأَسْبِغِ الْوُضُوْءَ ))
অর্থঃ ((তুমি যখন নামযে দাঁড়াবে (নামাযের পূর্বে) উত্তম রূপে ওযু করবে।))

. মুসল্লী বা নামাযী ব্যক্তি কেবলামুখী হবেঃ সে যে কোন জায়গায় থাক না কেন, তার সমস্ত শরীর ও মনকে যে ফরয বা নফল নামায আদায়ের ইচ্ছা করছে, অন্তরকে সেনামাযের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে। এবং মুখে নিয়্যত উচ্চারণ করবে না, কারণ মুখে নিয়্যত উচ্চারণ করা শরীয়ত সম্মত নয়; বরং বা তা বিদ’আত। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাগণ কেউ মুখে নিয়্যত উচ্চারণ করেননি।
সুন্নত হলো যে, নামাযী তিনি ইমাম হয়ে নামায আদায় করুন অথবা একা, তার সামনে সুত্রাহ (নামাযের সময় সামনে স্থাপিত সীমাচিহ্ন) রেখে নামায পড়বেন। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের সামনে সুত্রাহ ব্যবহার করে নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিবলামুখী হওয়া নামাযের শর্ত। তবে কোন কোন বিশেষ অবস্থা তার ব্যতিক্রম যা সুবিদিত বা সবার জানা এবং এ বিষয়ে আহ্লে ইলমদের কিতাবে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

. তাকবীরে তাহরীমাহঃ আল্লাহু আকবার বলে তাকবীরে তাহরীমা দিয়ে নামাযে দাঁড়াবে এবং দৃষ্টিকে সিজদার স্থানে নিবদ্ধ রাখবে।

. তাকবীরে তাহরীমায় হাত উত্তোলনঃ তাকবীরে তাহরীমার সময় উভয় হাতকে কাঁধ অথবা কানের লতি বরাবর উঠাবে।

. বুকে হাত বাঁধাঃ এরপর ডান হাতের তালুকে বাম হাতের উপরের কব্জি অথবা বাহু ধারণ করে উভয় হাতকে বুকের উপর রাখবে। বুকের উপর হাত রাখা সম্পর্কে সাহাবী অয়েল ইবনে হুজর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এবং কাবীসাহ্ ইবনে হুলব আততায়ী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু, তিনি তার পিতা থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

. সানা পড়াঃ দো’আ ইস্তেফ্তাহ (সানা) পাঠ করা সুন্নাত। দো’আ ইস্তেফ্তাহ নিম্নরূপঃ
(( اَللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِيْ وَبَيْنَ خَطَاياَيَ كَمَا بَاعَدتَّ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ. اَللَّهُمَّ نَقِّنِيْ مِنْ خَطَايَايَ كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ. اَللَّهُمَّ اغْسِلْنِيْ مِنْ خَطَايَايَ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرْدِ. ))
উচ্চারণঃ ((আল্লা-হুম্মা বা-‘ইদ বাইনী ওয়া বাইনা খাতা-ইয়া-য়া, কামা- বা-‘আদ্তা বাইনাল মাশরিক্বী ওয়াল মাগরিবি, আল্লা-হুম্মা নাক্কিনী- মিন খাতা-ইয়া-য়া কামা- ইউনাক্কাছ্ ছাওবুল আবইয়াদু মিনাদ্দানাসি, আল্লা-হুম্মাগসিলনী- মিন খাতা-ইয়া-য়া বিল মা-য়ি, ওয়াছ্ছালজি, ওয়াল বারদি।))অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে আমার পাপগুলো থেকে এত দূরে রাখ যেমন পূর্ব ও পশ্চিম পরস্পরকে পরস্পর থেকে দূরে রেখেছ। হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে আমার পাপ হতে এমন ভাবে পরিষ্কার করে দাও, যেমন সাদা কাপড়কে ময়লা হতে পরিষ্কার করা হয়। হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে আমার পাপ হতে (পবিত্র করার জন্য) পানি, বরফ ও শিশির দ্বারা ধুয়ে পরিষ্কার করে দাও।)) [বুখারী ও মুসলিম]অন্য এক হাদীসে আবু হোরায়রাহ্ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, যদি কেউ চায় তাহলে পূর্বের দো’আর পরিবর্তে নিম্নের দো’আটিও পাঠ করতে পারে। কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তা পাঠ করার প্রমাণ রয়েছে-
(( سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ ))
উচ্চারণঃ ((সোবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাস্মুকা, ওয়া তা’আলা জাদ্দুকা ওয়া লা-ইলাহা গাইরুকা।))অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। তুমি প্রশংসাময়, তোমার নাম বরকতময়, তোমার মর্যাদা অতি উচ্চে, আর তুমি ব্যতীত সত্যিকার কোন মা’বূদ নেই।))পূর্বের দো’আ দু’টি ছাড়াও যদি কেউ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত অন্যান্য যে সমস্ত দো’আয়ে ইস্তেফ্তাহ বা সানা রয়েছে, তা পাঠ করে তবে কোন বাধা নেই। কিন্তু উত্তম হলো যে, কখনও এটি আবার কখনও অন্যটি পড়া। কারণ এর মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের পরিপূর্ণ অনুসরণ প্রতিফলিত হবে।এরপর বলবেঃ ((আ’উযু বিল্লাহি মিনাশ্ শাইত-নির রাজীম, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।)) অর্থঃ ((আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহ্ কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।)) অতঃপর সূরা আল-ফাতিহা পাঠ করবে । কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
(( لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ ))
অর্থঃ ((যে ব্যক্তি (নামাযে( সূরা ফতিহা পাঠ করে না তার নামায হয় না।)) [বুখারী ও মুসলিম] সূরা ফতিহা পাঠ শেষে জাহরী নামাযে (যেমনঃ মাগরিব, এশা ও ফজর( উচ্চস্বরে আওয়াজ করে এবং ছির্রি নামাযে (যেমনঃ জোহর ও আসর( মনে মনে আ-মীন বলবে।এরপর পবিত্র কুরআন থেকে যে পরিমাণ সহজসাধ্য হয় পাঠ করবে। উত্তম হলো যে, জোহর, আসর এবং এশার নামাযে কুরআন মজিদের আওছাতে মুফাচ্ছাল [সূরা নাস থেকে সূরা দোহা পর্যন্ত এবং ফজরে তেওয়াল [সূরা কাফ থেকে সূরা নাবা পর্যন্ত] আর মাগরিবে কিসার [সূরা দোহা থেকে সূরা নাস পর্যন্ত] থেকে পাঠ করা। মাগরিব নামাযে কখনও তেওয়াল অথবা আওসাত থেকে পাঠ করবে। এভাবে পাঠ করা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত রয়েছে। আসরের কিরআতকে জোহর এর কিরআত থেকে হালকা করা জায়েয আছে।

. রুকূঃ উভয় হাত দু’কাঁধ অথবা কান বরাবর উঠিয়ে আল্লাহু আকবার বলে রুকূতে যাবে। মাথাকে পিঠ বরাবর রাখবে এবং উভয় হাতের আঙ্গুলগুলিকে খোলাবস্থায় উভয় হাঁটুর উপরে রাখবে। রুকূতে ইতমিনান বা স্থিরতা অবলম্বন করবে। এরপর বলবেঃ ((সুবহানা রাব্বি’আল ‘আজীম))। অর্থঃ ((আমি আমার মহান প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করছি।)) দো’আটি তিন বা তার অধিক পড়া ভাল এবং এর সাথে নিম্নের দো’আটিও পাঠ করা মুস্তাহাব-জায়েয।
(( سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّناَ وَبِحَمْدِكَ اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيْ ))
উচ্চারণঃ ((সোবহানাকা আল্লাহুম্মা রাব্বানা ওয়া বিহামদিকা আল্লাহুম্মাগ্ ফিরলি।))অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! আমাদের প্রতিপালক, তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি তোমার প্রশংসা সহকারে। হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর।))

. রুকূ থেকে উঠাঃ উভয় হাত কাঁধ অথবা কান বরাবর উঠিয়ে ((সামি’আল্লাহু লিমান হামিদাহ্)) বলে রুকূ থেকে মাথা উঠাবে। ইমাম বা একাকী উভয়ই দো’আটি পাঠ করবে। রুকূ থেকে খাড়া হয়ে বলবেঃ
(( رَبَّنَاوَلَكَ الْحَمْدُ،حَمْدًا كَثِيْرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا ِفيْهِ؛ مِلْءَ السَّمَاوَاتِ وَ مِلْءَ الْأَرْضِ؛ وَمِلَءَ ماَ بَيْنَهُمَا ؛ وَمِلْءَ ماَ شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ. ))
উচ্চারণঃ ((রাব্বানা- ওয়া লাকাল হামদ্, হামদান্ কাছী-রান্ তাইয়্যেবাম্ মুবা-রাকান ফি-হ, মিল্আস্ সামা-ওয়া-তি ওয়া মিল্আল্ ‘আরদি, ওয়া মিল্আ মা বাইনাহুমা, ওয়া মিল্আ মা শি’তা মিন শাইয়িম বা’দু।))অর্থঃ ((হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার জন্যই সমস্ত প্রশংসা। তোমার প্রশংসা অসংখ্য, উত্তম ও বরকতময়, যা আকাশ ভর্তি করে দেয়, যা পৃথিবী পূর্ণ করে দেয়, উভয়ের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করে এবং এগুলো ছাড়া তুমি অন্য যা কিছু চাও তাও পূর্ণ করে দেয়।)) পূর্বের দো’আটির পরে যদি নিম্নের দো’আটিও পাঠ করা হয় তাহলে ভাল-
(( أَهْلُ الثَّنَاءِ وَالْمَجْدِ؛ أَحَقُّ مَا قاَلَ الْعَبْدُ؛ وَكُلُّناَلَكَ عَبْدٌ؛ اَللَّهُمَّ لاَمَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلاَ مُعْطِىَ لِمَا مَنَعْتَ وَلاَ يَنْفَعُ ذَالْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ.))
উচ্চারণঃ ((আহলুস্ সানা-য়ি ওয়াল মাজদি, আহাক্কু মা কা-লাল ‘আবদু, ওয়া কুল্লানা- লাকা ‘আব্দুন। আল্লা-হুম্মা! লা- মা-নি’আ লিমা- আ’তাইতা ওয়ালা- মু’তিয়া লিমা- মানা’তা, ওয়ালা ইয়ানফা’উ যাল্ জাদ্দি মিনকাল্ জাদ্দু।))অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! তুমিই প্রশংসা ও মর্যাদার হক্কদার, বান্দাহ যা বলে তার চেয়েও তুমি অধিকতর হকদার। এবং আমরা সকলে তোমারই বান্দাহ্। হে আল্লাহ্! তুমি যা দান করেছো, তার প্রতিরোধকারী কেউ নেই। আর তুমি যা নিষিদ্ধ করেছো তা প্রদানকারীও কেউ নেই। এবং কোন সম্মানী ব্যক্তি তার উচ্চ মর্যাদা দ্বারা তোমার দরবারে উপকৃত হতে পারবে না।))কোন কোন সহীহ্ হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এই (পূর্বের) দো’আটি পড়া প্রমাণিত আছে। আর মুকতাদী হলে রুকূ থেকে উঠার সময় ((রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ. . . . .)) দো’আটি শেষ পর্যন্ত পড়বে। রুকূ থেকে মাথা উঠানোর পর ইমাম ও মুকতাদী সকলের জন্য দাড়ানো অবস্থায় যে ভাবে উভয় হাত বুকের উপর ছিল সে ভাবে বুকের উপর উভয় হাত রাখা মুস্তাহাব। এ বিষয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অয়েল ইবনে হুজর এবং সাহল বিন সা’দ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা -এর বর্ণিত হাদীস থেকে প্রমাণিত।

. সিজদাহঃ ((আল্লাহু আকবার)) বলে যদি কোন প্রকার কষ্ট না হয় তা হলে দুই হাটু উভয় হাতের আগে (মাটিতে রেখে) সিজদায় যাবে। আর কষ্ট হলে উভয় হাত হাটুর পূর্বে (মাটিতে) রাখা যাবে। হাত ও পায়ের আঙ্গুলগুলি কিব্লামুখী থাকবে। এবং হাতের আঙ্গুলগুলি মিলিত ও প্রসারিত হয়ে থাকবে। সিজদাহ্ হবে সাতটি অঙ্গের উপর। অঙ্গগুলো হলোঃ নাক সহ কপাল, উভয় হাতুলী, উভয় হাঁটু এবং উভয় পায়ের আঙ্গুলের ভিতরের অংশ।সিজদায় গিয়ে বলবেঃ ((সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা)) অর্থঃ ((আমার সর্বোচ্চ প্রতিপালকের [আল্লাহর] প্রশংসা করছি।)) তিন বা তার অধিকবার তা পুনরাবৃত্তি করবে। এর সাথে
নিম্নের দো’আটি পড়া মুস্তাহাব-
(( سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّناَ وَبِحَمْدِكَ اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِيْ ))
উচ্চারণঃ ((সোবহানাকা আল্লাহুম্মা রাব্বানা ওয়া বিহামদিকা আল্লাহুম্মাগ্ফিরলি।))অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! আমাদের প্রতিপালক, তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি তোমার প্রশংসা সহকারে। হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর।)) সিজদায় বেশি বেশি দো’আ করা মুস্তাহাব। কেননা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ
(( فأما الركوع فعظموا فيه الرب وأما السجود فاجتهدوا في الدعاء فقمن أن يستجاب ))
অর্থঃ ((তোমরা রুকূ অবস্থায় মহান প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব বর্ণনা কর এবং সিজদারত অবস্থায় অধিক দো’আ পড়ার চেষ্টা কর, কেননা তোমাদের দো’আ’ কবুল হওয়ার উপযোগী।)) [মুসলিম] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম আরো এরশাদ করেনঃ
(( أَقْرَبُ مَا يَكُوْنُ الْعَبْدُ مِن رَّبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ فَأَكْثِرُوْا الدُّعَاءَ. ))
অর্থঃ ((বান্দাহ্ সিজদাহ্ অবস্থায় তার প্রতিপালকের অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। অতএব এই অবস্থায় তোমরা বেশি বেশি দো’আ করবে।)) [মুসলিম] ফরয অথবা নফল উভয় নামাযে মুসলিম [নামাযী] সিজদার মধ্যে তার নিজের এবং মুসলমানদের জন্য আল্লাহ্ কাছে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের জন্য দো’আ করবে। সিজদার সময় উভয় বাহুকে পার্শ্বদেশ থেকে, পেটকে উভয় উরু এবং উভয় উরু পিন্ডলী থেকে আলাদা রাখবে। এবং উভয় বাহু [কনুই] মাটি থেকে উপরে রাখবে। (কেননা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম কুনইকে মাটির সাথে লাগাতে নিষেধ করেছেন।) নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ
(( اِعْتَدِلُوْا فِي السُّجُوْدِ وَلاَيبسِطُ أَحْدُكُمْ ذِرَاعَيْهِ إِنْبِسَاطَ الْكَلْبِ.)) [متفق عليه] অর্থঃ ((তোমরা সিজদায় বরাবর সোজা থাকবে। তোমাদের কেউ যেন তোমাদের উভয় হাতকে কুকুরের ন্যায় বিছিয়ে প্রসারিত না রাখে।)) [বুখারী ও মুসলিম]

১০. সিজদা থেকে উঠাঃ ((আল্লাহু আকবার)) বলে (সিজদাহ থেকে) মাথা উঠাবে। বাম পা বিছিয়ে দিয়ে তার উপর বসবে এবং ডান পা খাড়া করে রাখবে। দু’হাত তার উভয় রান (উরু) ও হাঁটুর উপর রাখবে। এবং নিম্নের দো’আটি বলবে-
(( رَبِّ اغْفِرْلِيْ؛ رَبِّ اغْفِرْلِيْ؛ رَبِّ اغْفِرْلِيْ؛ اَللَّهُمَ اغْفِرْلِيْ، وَارْحَمْنِيْ وَاهْدِنِيْ وَارْزُقْنِيْ وَعَافِنِيْ وَاجْبُرْنِيْ.))
উচ্চারণঃ ((রব্বিগ্ফিরলী-, রব্বিগ্ফিরলী-, রব্বিগ্ফিরলী-, আল্লাহুম্মাগ্ফিরলী-, ওয়ারহামনী-, ওয়াহদিনী-, ওয়ারযোকনী-, ওয়া ‘আ-ফিনী-, ওয়াজবুরনী-।))অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর, হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর, হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর। হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর, আমাকে রহম কর, আমাকে হেদায়াত দান কর, আমাকে রিযিক দান কর, আমাকে সুস্থ্যতা দান কর এবং আমার ক্ষয়ক্ষতি পূরণ কর।))এই বৈঠকে ধীর স্থির থাকবে যাতে প্রতিটি হাড়ের জোর তার নিজস্ব স্থানে ফিরে যেতে পারে রুকূর পরের ন্যায় স্থির দাঁড়ানোর মতো। কেননা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম রুকূর পরে ও দু’সিজদার মধ্যবর্তী সময়ে স্থিরতা অবলম্বন করতেন।১১. দ্বিতীয় সিজদাহঃ ((আল্লাহু আকবার)) বলে দ্বিতীয় সিজদাহ করবে। এবং দ্বিতীয় সিজদায় তাই করবে প্রথম সিজদায় যা করেছিল।

১২. আরামের বৈঠকঃ সিজদাহ থেকে ((আল্লাহু আকবার)) বলে মাথা উঠাবে। ক্ষণিকের জন্য বসবে, যে ভাবে উভয় সিজদার মধ্যবর্তী সময়ে বসেছিল। এ ধরনের পদ্ধতিতে বসাকে ((জলসায়ে ইসতেরাহা)) বা আরামের বৈঠক বলা হয়। আলেমদের দু’টি মতের মধ্যে অধিক সহীহ্ মতানুসারে এ ধরনের বসা মুস্তাহাব এবং তা ছেড়ে দিলে কোন দোষ নেই। ((জলসায়ে ইস্তেরাহা)) এ পড়ার জন্য (নির্দিষ্ট) কোন দো’আ নেই।অতঃপর দ্বিতীয় রাক’আতের জন্য যদি সহজ হয় তাহলে উভয় হাঁটুতে ভর করে উঠে দাঁড়াবে। তার প্রতি কষ্ট হলে উভয় হাত মাটিতে ভর করে দাঁড়াবে।
এরপর (প্রথমে) সূরা ফাতিহা এবং কুরআনের অন্য কোন সহজ সূরা পড়বে। প্রথম রাকআতে যেভাবে করেছে ঠিক সে ভাবেই দ্বিতীয় রাকআতেও করবে। মুকতাদী তার ইমামের পূর্বে কোন কাজ করা জায়েয নেই। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে এ রকম করা থেকে সতর্ক করেছেন। ইমামের সাথে সাথে (একই সঙ্গে) করা মাকরূহ। সুন্নাত হলো যে, মুকতাদীর প্রতিটি কাজ কোন শিথিলতা না করে ইমামের আওয়াজ শেষ হওয়ার সাথে হবে। এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনঃ
(( إنما جعل الإمام ليؤتم به فلا تختلفوا عليه؛ فإذا كبر فكبروا؛ وإذا ركع فاركعوا؛ وإذا قال سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، فقولوا رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ؛ وإذا سجد فاسجدوا. )) [متفق عليه] অর্থঃ ((ইমাম এই জন্যই নির্ধারণ করা হয়, যাতে তাকে অনুসরণ করা হয়, তার প্রতি তোমরা ইখতেলাফ করবে না। সুতরাং ইমাম যখন আল্লাহু আকবার বলবে তোমরাও “আল্লাহু আকবার” বলবে এবং যখন তিনি রুকূ করবেন তোমরাও রুকূ করবে এবং তিনি যখন “সামি’আল্লাহু লিমান হামিদাহ” বলবেন তখন তোমরা “রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ” বলবে আর ইমাম যখন সিজদাহ করবেন তোমরাও সিজদাহ করবে।)) [বুখারী ও মুসলিম]

১৩. প্রথম বৈঠকঃ নামায যদি দু’রাক্আত বিশিষ্ট হয় যেমনঃ ফজর, জুমআ ও ঈদের নামায, তা’হলে দ্বিতীয় সিজদাহ থেকে মাথা উঠিয়ে ডান পা খাড়া করে বাম পায়ের উপর বসবে। ডান হাত ডান উরুর উপর রেখে শাহাদাত বা তর্জনী আঙ্গুলি ছাড়া সমস্ত আঙ্গুল মুষ্টিবদ্ধ করে দো’আ ও আল্লাহর নাম উল্লেখ করার সময় শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা নাড়িয়ে তাওহীদের ইশারাহ্ করবে। যদি ডান হাতের কনিষ্ঠা ও অনামিকা বন্ধ রেখে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি মধ্যমাঙ্গুলির সাথে মিলিয়ে গোলাকার করে শাহাদাত বা তর্জনী দ্বারা ইশারা করে তবে তা ভাল। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দু’ধরনের বর্ণনাই প্রমাণিত। উত্তম হলো যে, কখনও এভাবে এবং কখনও ওভাবে করা। এবং বাম হাত বাম উরু ও হাঁটুর উপর রাখবে।
অতঃপর এই বৈঠকে তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যতু) পড়বে। তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যতুঃ
(( اَلتَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ، السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ، السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِيْنَ، أَشْهَدُ أَن لَّاإِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ.))
উচ্চারণঃ ((আত্তাহিয়্যা-তু লিল্লাহি ওয়াস্ সালাওয়া-তু ওয়াত্ তাইয়্যিবা-তু আস্ সালা-মু ‘আলাইকা আইয়্যুহান্নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লা-হি ওয়া বারাকা-তুহু, আস্ সালামু ‘আলাইনা- ওয়া আলা- ‘ইবাদিল্লা-হিস্ সা-লেহী-ন। আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান্ ‘আব্দুহু- ওয়া রাসূলুহ্।))অর্থঃ ((যাবতীয় ইবাদত, মৌখিক, শারীরিক ও আর্থিক সমস্তই আল্লাহ্র জন্য। হে নবী, আপনার উপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বরকত অবতীর্ণ হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্ বান্দাহ ও তাঁর রাসূল।)) অতঃপর [দরূদ] বলবেঃ
(( اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ, وبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِْيدٌ مَجِيْدٌ .))
উচ্চারণ: ((আল্লাহুম্মা সল্লি ‘আলা- মুহাম্মাদিউঁ ওয়া’আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন, কামা- সল্লাইতা ‘আলা- ইব্রা-হী-মা ওয়া আলা- আ-লি ইব্রা-হী-মা ইন্নাকা হামীদুম মাজী-দ। ওয়া বা-রিক ‘আলা মুহাম্মাদিউঁ ওয়া’আলা- আ-লি মুহাম্মাদিন কামা বা-রাকতা আলা- ইব্রা-হী-মা ওয়া’আলা- আ-লি-ইব্রা-হী-মা ইন্নাকা হামীদুম মাজী-দ।))অর্থঃ ((হে আল্লাহ্! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর রহমত বর্ষণ কর। যেমন তুমি ইব্রাহীম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর রহমত বর্ষণ করেছ। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও গৌরবান্বিত। এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর বরকত নাযিল কর, যেমন তুমি ইব্রাহীম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর নাযিল করেছ। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও গৌরাবান্বিত।))অতঃপর নিম্নের দো’আটি পড়বেঃ এতে আল্লাহর নিকট চারটি ভয়াবহ বস্তু থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে-
(( اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ ومِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ ومِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيْحِ الدَّجَّال))
উচ্চারণঃ ((আল্লা-হুম্মা ইন্নী- আ’ঊযুবিকা মিন আযা-বি জাহান্নাম, ওয়া মিন আযা-বিল ক্বাব্রি, ওয়া মিন ফিত্নাতিল্ মাহ্ইয়া- ওয়ালমামা-তি ওয়া মিন ফিত্নাতিল মাসী-হিদ্দাজ্জা-ল।))অর্থঃ ((আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় কামনা করি জাহান্নামের আযাব থেকে, কবরের শাস্তি থেকে, জীবন ও মৃত্যুর যন্ত্রণা থেকে এবং মাসীহ দাজ্জালের ফেৎনা থেকে।))এরপর দুনিয়া ও আখেরাতের মঙ্গল কামনা করে নিজের পছন্দমত যে কোন দো’আ করবে। ব্যক্তি যদি তার পিতা-মাতা ও অন্যান্য মুসলমানের জন্য দো’আ করে তাতে কোন দোষ নেই। দো’আ করার বিষয়ে ফরয অথবা নফল সালাতে কোনই পার্থক্য নেই। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের কথায় ব্যাপকতা রয়েছে, ইবনে মাসউদের হাদীসে যখন তিনি তাশাহহুদ শিক্ষা দিচ্ছিলেন তখন বলেছিলেনঃ
(( ثُمَّ لِيَتَخَيَّرْ مِنَ الدُّعاَءِ أَعْجَبَهُ إِلَيْهِ فَيَدْعُوْا ))
অর্থঃ ((অতঃপর তার কাছে যে দো’আ পছন্দনীয়, তা নির্বাচন করে দো’আ করবে।)) অন্য এক বর্ণনায় আছে,
(( ثُمَّ يَتَخَيَّرْ مِنَ الْمَسْأَلَةِ مَا شَاءَ ))
অর্থঃ(( অতঃপর যা ইচ্ছা চেয়ে দো’আ করতে পারে।)) এই দো’আগুলি যেন বান্দাহর দুনিয়া ও আখেরাতের সমস্ত বিষয়কে শামিল করে। অতঃপর (নামাযী) তার ডান দিকে (তাকিয়ে)- السلام عليكم ورحمة الله ((আস্সালা-মু ‘আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ্)) অর্থঃ ((তোমাদের উপর শান্তি ও আল্লাহ্ রহমত বর্ষিত হোক)) এবং বাম দিকে (তাকিয়ে) ((আস্সালা-মু ‘আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ্)) বলে ছালাম ফিরাবে বা সালাত সমাপ্ত করবে।

১৪. তিন বা চার রাকাআত বিশিষ্ট নামাযেঃ নামায যদি তিন রাকা’আত বিশিষ্ট হয় যেমন, মাগরিবের নামায অথবা চার রাকা’আত বিশিষ্ট যেমন, জোহর, আছর ও এশার নামায, তাহলে পূর্বোল্লেখিত ((তাশাহহুদ)) পড়বে এবং এর সাথে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদও পাঠ করা যাবে। অতঃপর ((আল্লাহু আকবার)) বলে হাঁটুতে ভর করে (সোজা হয়ে) দাঁড়িয়ে উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠিয়ে পূর্বের ন্যায় বুকের উপর রাখবে। এবং শুধু সূরা ফাতিহা পড়বে। যদি কেউ জোহর ও আসরের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকা’আতে কখনও সূরা ফাতিহার পর অতিরিক্ত অন্য কোন সূরা পড়ে ফেলে তবে কোন বাধা নেই। কেননা, এ বিষয়ে আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কতৃক নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণিত আছে। প্রথম তাশাহহুদে যদি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠ করা ছেড়ে দেয় এতেও কোন ক্ষতি নেই। কারণ প্রথম বৈঠকে দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।
অতঃপর মাগরিবের নামাযের তৃতীয় রাকা’আত এবং জোহর, আসর ও এশার নামাযের চতুর্থ রাকাআতের পর তাশাহহুদ পড়বে এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করবে আর আল্লাহ্ কাছে জাহান্নামের আযাব, কবরের আযাব, জীবিত ও মৃত্যুর ফেৎনা এবং মাসীহে দাজ্জালের ফেৎনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে এবং বেশি বেশি দো’আ করবে।
===
নামাযের শেষ বৈঠকে এবং এর পরবর্তী সময়ে সুন্নাতী কিছু দোআঃ

———————————————————————–


আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম অধিক সময় নিম্নের দো’আটি পাঠ করতেন।
(( رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ ))
উচ্চারণঃ ((রব্বানা- আ-তিনা- ফিদ্দুনিয়া- হাসানাতান, ওয়া ফিল আখেরাতি হাসানাতান, ওয়াক্বিনা- আযা-বান্না-র।))
অর্থঃ ((হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতে কল্যাণ দান করুন এবং আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।)) যেমন তা দু’রাকা’আত বিশিষ্ট নামাযে উল্লেখ হয়েছে।
অতঃপর যখন শেষ বৈঠকের জন্য বসবে তখন এ বৈঠকে তাওয়াররুক করে বসবে অর্থাৎ, ডান পা খাড়া করে এবং বাম পা ডান পায়ের নিম্ন দিয়ে বের করে রাখবে। পাছা যমীনের উপর রাখবে। এ বিষয়ে আবু হুমাইদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এরপর সব শেষে ((আস্সালামু ‘আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ্)) বলে প্রথমে ডান দিকে এবং পরে বাম দিকে সালাম ফিরাবে।
সালামের পর ৩ বার أستغفر الله ((আস্তাগফিরুল্লাহ্)) পড়বে (অর্থঃ আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি)) তারপর নিম্নের দো’আগুলো ১ বার করে পড়বেঃ
(( اَللَّهُمَّ أنْتَ الّسَّلاَمُ وَمِنْكَ السَّلاَمُ تَبَارَكْتَ يَاذَاالْجَلاَلَِ واْلإِكْرَامِ ))
উচ্চারণঃ ((আল্লা-হুম্মা আনতাস্ সালা-মু, ওয়ামিনকাস্ সালা-মু, তাবা-রাকতা ইয়া-যাল জালা-লি ওয়াল ইকরা-ম।))
অর্থঃ ((হে আল্লাহ্, তুমি প্রশান্তি দাতা, আর তোমার কাছেই শান্তি, তুমি বরকতময়, হে মর্যাদাবান এবং কল্যাণময়।))
(( لاَإِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَهُ؛ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ; اَللَّهُمَّ لاَمَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلاَ مُعْطِىَ لِمَا مَنَعْتَ وَلاَ يَنْفَعُ ذَاالْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ; لاَحَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ ؛ لاإِلَهَ إ لاَّ اللهُ وَلاَ نَعْبُدُ إِلاَّ إِيَّاهُ؛ لَهُ النِّعْمَةُ َولَهُ الْفَضْلُ وَلَهُ الثَّنَاءُ الْحَسَنُ ؛ لاَ إِلَه اِلاَّ اللهُ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ وَلَوْكَرِهَ الْكَافِرُوْنَ. ))
উচ্চারণঃ ((লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহু- লা-শারী-কালাহু, লাহুল মুল্কু, ওয়ালাহুল হাম্দু, ওয়াহুয়া ‘আলা- কুল্লি শায়্যিন ক্বাদী-র। আল্লা-হুম্মা লা- মা-নি’আ লিমা- আ’তাইতা, ওয়ালা- মু’তিয়া লিমা- মানা’তা, ওয়ালা ইয়ানফা’উ যালজাদ্দি মিনকালজাদ্দু। লা- হাওলা ওয়ালা- কুওওয়াতা ইল্লা- বিল্লা-হি, লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু, ওয়ালা- না’বুদু ইল্লা- ইয়্যা-হু, লাহুন্নি’মাতু ওয়ালাহুল ফাদ্বলু, ওয়ালাহুস্ ছানা-উল হাসানু, লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু মুখলিসী-না লাহুদ্দী-না ওয়ালাউ কারিহাল কা-ফিরূন।))অর্থঃ ((আল্লাহ্ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই, সকল বাদশাহী ও সকল প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সব কিছুর উপরেই ক্ষমতাশালী। হে আল্লাহ! তুমি যা দান করেছো, তার প্রতিরোধকারী কেউ নেই। আর তুমি যা নিষিদ্ধ করেছো তা প্রদানকারীও কেউ নেই। এবং কোন সম্মানী ব্যক্তি তার উচ্চ মর্যাদা দ্বারা তোমার দরবারে উপকৃত হতে পারবে না। তোমার শক্তি ছাড়া অন্য কোন শক্তি নেই। আল্লাহ্ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই। আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করি, নেয়ামতসমূহ তাঁরই, অনুগ্রহও তাঁর এবং উত্তম প্রশংসা তাঁরই। আল্লাহ্ ছাড়া কোন (সত্য) মা’বূদ নেই। আমরা তাঁর দেয়া জীবন বিধান একমাত্র তাঁর জন্যই একনিষ্ঠ ভাবে পালন করি। যদিও কাফেরদের নিকট তা অপছন্দনীয়।))سبحان الله ((সোবহানাল্লাহ্)) (আল্লাহ্ মহাপবিত্র) ৩৩ বার, الحمد لله ((আল-হামদুলিল্লাহ্)) (সকল প্রশংসা আল্লাহর) ৩৩ বার এবং الله أكبر (( আল্লাহু আকবার)) (আল্লাহ্ সবচেয়ে বড়) ৩৩ বার পড়বে আর একশত পূর্ণ করতে নিম্নের দো’আটি পড়বে।
(( لاَإِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَهُ ؛ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَعَلىكُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ ))
উচ্চারণঃ ((লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহু লা-শারী-কালাহু, লাহুল মুল্কু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়াহুয়া ‘আলা- কুল্লি শাইইন ক্বাদী-র।))অর্থঃ ((আল্লাহ্ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। সকল বাদশাহী ও সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য। তিনিই সব কিছুর উপর ক্ষমতাশালী।)) অতঃপর আয়াতুল কুরসী পাঠ করবেঃ
(( اللّهُ لاَ إِلَـهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لاَ تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلاَ نَوْمٌ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلاَ يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلاَّ بِمَا شَاء وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ وَلاَ يَؤُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ.)) [سورة البقرة: 255] উচ্চারণঃ ((আল্লাহু লা- ইলাহা ইল্লা- হুওয়া, আল হাইয়্যুল কাইয়্যু-ম, লা-তা’খুযুহু ছিনাতুউঁ- ওয়ালা- নাউ-ম, লাহু- মা- ফিচ্ছামা-ওয়া-তি ওয়ামা- ফিল ‘আরদি; মান্ যাল্লাযী- ইয়াশফা’উ ‘ইন্দাহু- ইল্লা- বিইয্ নিহি, ই’য়ালামু মা-বাইনা আইদী-হিম ওয়ামা- খালফাহুম, ওয়ালা- ইউহী-তূ-না বিশাইয়িম্ মিন ‘ইলমিহী-, ইল্লা- বিমা-শা-আ, ওয়াছি’আ কুরছিয়্যুহুচ্ছামা-ওয়া-তি, ওয়াল ‘আরদা, ওয়ালা- ইয়াউ-দুহু হিফজুহুমা- ওয়াহুয়াল ‘আলিয়্যুল আযী-ম।))অর্থঃ ((আল্লাহ্; তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) মাবূদ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক, তাঁকে তন্দ্রা এবং নিদ্রা স্পর্শ করতে পারে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তাঁর। কে আছে এমন যে, তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত আছেন। যতটুকু তিনি ইচ্ছে করেন, ততটুকু ছাড়া তারা তাঁর জ্ঞানের কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না। তাঁর কুরসী সমস্ত আকাশ ও পৃথিবী পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে রক্ষণা-বেক্ষণ করা তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনি মহান শ্রেষ্ঠ।)) [সূরা আল-বাকারাহঃ ২৫৫]প্রত্যেক নামাযের পর আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাছ পড়বে। মাগরিব ও ফজর নামাযের পরে এই সূরা তিনটি (ইখলাস, ফালাক এবং নাছ) তিনবার করে পুনরাবৃত্তি করা মুস্তাহাব। কারণ, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ সম্পর্কে সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। একই ভাবে পূর্ববর্তী দো’আগুলির সাথে ফজর ও মাগরিবের নামাযের পর নিম্নের দো’আটি বৃদ্ধি করে দশ বার করে পাঠ করা মুস্তাহাব। কারণ, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ সম্পর্কে (হাদীসে) প্রমাণিত আছে।
(( لاَإِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَهُ ؛ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْييِ وَيُمِيْتُ وَهُوَعَلىكُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ.))
উচ্চারণঃ ((লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হু, ওয়াহদাহু- লা-শারী-কালাহু, লাহুল মুলকু, ওয়ালাহুল হামদু, ইওহ য়ী- ওয়া ইউমী-তু ওয়াহুয়া ‘আলা- কুল্লি শায়্যিন ক্বাদী-র।))অর্থঃ ((আল্লাহ্ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই, তিনি একক ,তাঁর কোন শরীক নেই। সকল বাদশাহী ও সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য। তিনিই জীবিত করেন ও মৃত্যু দান করেন। তিনিই সব কিছুর উপরে ক্ষমতাশালী।))
অতঃপর ইমাম হলে তিনবার ((আছ্তাগফিরুল্ল্লাহ)) এবং ((আল্লা-হুম্মা আন্তাস্ সালা-মু, ওয়ামিনকাস্ সালা-মু, তাবা-রাকতা ইয়া- যাল জালা-লি ওয়াল ইকরা-ম।)) বলে মুকতাদীদের দিকে ফিরে মুখোমুখী হয়ে বসবে। অতঃপর পূর্বোল্লেখিত দো’আগুলি পড়বে। এ বিষয়ে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে, এর মধ্য থেকে সহীহ মুসলিমে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা কর্তৃক নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে। এই সমস্ত আযকার বা দো’আ পাঠ করা সুন্নাত; ফরয নয়।
প্রত্যেক মুসলমান নারী এবং পুরুষের জন্যে জোহর নামযের পূর্বে ৪ রাকা’আত এবং পরে ২ রাকা’আত, মাগরিবের নামাযের পর ২ রাকা’আত, এশার নামাযের পর ২ রাকা’আত এবং ফজরের নামযের পূর্বে ২ রাকা’আত। এই মোট ১২ রাকা’আত নামায পড়া মুস্তাহাব। এই ১২ রাকা’আত নামাযকে ‘সুনানে রাওয়াতিব’ বলা হয়। কারণ, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত রাকা’আতগুলি মুকীম অবস্থায় নিয়মিত যত্ন সহকারে আদায় করতেন। আর সফরের অবস্থায় ফজরের সুন্নাত ও (এশা পরবর্তী) বিতর ব্যতীত অন্যান্য রাকা’আতগুলি ছেড়ে দিতেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম সফর এবং মুকীম অবস্থায় উক্ত ফজরের সুন্নাত ও বিতর নিয়মিত আদায় করতেন। তাই আমাদের জন্য নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামের আমলই হলো উত্তম আদর্শ। আল্লাহ্ তা’আলা এরশাদ করেনঃ
(( لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ )) [الأحزاب: 21] অর্থঃ ((নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম) এর মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।)) [সূরা আল-আহযাবঃ ২১] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনঃ
(( صَلٌّوْا كَمَا رَأَيْتُمُوْنِيْ أُصَلِّيْ. )) [رواه البخاري] অর্থঃ ((তোমরা সেভাবে নামায আদায় কর, যে ভাবে আমাকে নামায আদায় করতে দেখ।)) [বুখারী] এই সমস্ত সুনানে রাওয়াতিব এবং বিতরের নামায নিজ ঘরে পড়াই উত্তম। যদি কেউ তা মসজিদে পড়ে তাতে কোন দোষ নেই। এ সম্পর্কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনঃ
(( أَفْضَلُ صَلاَةِ الْمَرْءِ فِيْ بَيْتِهِ إِلاَّ الْمَكُْوْبَةْ )) [متفق علىصحته] অর্থঃ ((ফরয নামায ব্যতীত মানুষের অন্যান্য নামায (নিজ) ঘরে পড়াই উত্তম।)) [বুখারী ও মুসলিম, হাদীসটি সহীহ] এই সমস্ত রাকা’আতগুলি (দৈনিক ১২ রাকা’আত নামায) নিয়মিত যত্ন সহকারে আদায় করা হলো জান্নাতে প্রবেশের একটি মাধ্যম। সহীহ মুসলিমে উম্মে হাবীবাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ
(( مَا مِنْ عَبْدٍ مُسْلِمٍ يُصَلِّيْ لِلَّهِ كُلَّ يَوْمٍ ثِنْتَيْ عَشَرَةَ رَكْعَةً تَطَوُعًا إِلاَّ بَنَى اللَّهُ لَهُ بَيْتاً فِي الْجَنَّةِ. )) [مسلم] অর্থঃ ((যে কোন মুসলিম ব্যক্তিই আল্লাহ্ জন্য (খালেস নিয়্যতে) দিবা-রাত্রে ১২ রাকা’আত নফল নামায পড়বে, আল্লাহ্ অবশ্যই তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানাবেন।)) আমরা যা পূর্বে উল্ল্লেখ করেছি ইমাম তিরমিযী তার বর্ণনায় অনুরূপ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যদি কেউ আসরের নামাযের পূর্বে ৪ রাকা’আত এবং মাগরিবের নামাযের পূর্বে ২ রাকা’আত এবং এশার নামাযের পূর্বে ২ রাকা’আত পড়ে, তা হলে তা উত্তম হবে। কেননা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
(( رَحِمَ اللَّهُ امْرَأً صَلَّى أَرْبَعًا قَبْلَ الْعَصْرِ.))
অর্থঃ ((আল্লাহ্ ঐ ব্যক্তির উপর রহম করুন, যে আসরের (ফরয( নামাযের পূর্বে চার রাকা’আত (নফল( নামায পড়ে থাকে।)) হাদীসটি ইমাম আহমাদ, আবুদাউদ, তিরমিযী বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন এবং ইবনে খুযায়মাহ সহীহ বলেছেন। রাসূলুল্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
(( بَيْنَ كُلِّ أَذَانَيْنِ صَلاَةٌ ؛ بَيْنَ كُلِّ أَذَانَيْنِ صَلاَةٌ ؛ ثُمَّ قَالَ فِي الثَّالِثَةِ لِمَنْ شَاءَ )) [بخاري] অর্থঃ ((প্রত্যেক আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে (নফল( নামায, প্রত্যেক আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে (নফল( নামায।)) তৃতীয় বার বলেন ((যে ব্যক্তি পড়ার ইচ্ছে করে।)) [বুখারী] যদি কেউ জোহরের পূর্বে ৪ রাকা’আত এবং পরে ৪ রাকা’আত পড়ে তবে তা ভাল। এর প্রমাণে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লামে হাদীস; তিনি বলেনঃ
(( مَنْ حَافَظَ عَلَى أَرْبَعٍ قَبْلَ الظُّهْرِ وَأَرْبْعٍ بَعْدَهَا حَرَّمَهُ اللَّهُ تَعَالىَ عَلَى النّاَرِ )) [أحمد, صحيح] অর্থঃ ((যে ব্যক্তি জোহরের পূর্বে ৪ রাকা’আত ও পরে ৪ রাকা’আত (সুন্নাত নামায( এর প্রতি যত্নবান থাকে, আল্লাহ্ তা’আলা তার উপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিবেন।)) [ইমাম আহমাদ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং আহলে সুনান সহীহ সূত্রে উম্মে হাবীবাহ থেকে উল্ল্লেখ করেছেন] অর্থাৎ সুনানে রাতেবার নামাযে জোহরের পরে ২ রাকা’আত বৃদ্ধি করে পড়বে। কারণ জোহরের পূর্বে ৪ রাকা’আত এবং পরে ২ রাকা’আত পড়া সুনানে রাতেবাহ। অতএব জোহরের পরে ২ রাকা’আত বৃদ্ধি করলে উম্মে হাবীবাহর হাদীসের প্রতি আমল হবে। আল্লাহ্ই তাওফীকদাতা। দরূদ ও ছালাম বর্ষিত হোক, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সাহাবাগণের প্রতি এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তাঁর ইত্তেবা’ বা অনুসরণ করবেন তাদের প্রতিও।
>>>সমাপ্ত<<<

 

ঈমানের স্তম্ভসমূহ (১)

بسم الله الرحمن الرحيم

أركان الإيمان

আরকানুল ঈমান বা ঈমানের স্তম্ভসমূহ

গ্রন্থনাঃ দ্বীনী গবেষণা অধিদপ্তর, ইসলামী বিশ্ববিদ্বালয় মদীনা মুনওয়ারা, সৌদি আরব।

অনুবাদঃ মুহাম্মাদ ইব্রাহীম আব্দুল হালীম

আর্কানুল ঈমান, বা ঈমানের স্তম্ভসমূহঃ

তা হলো আল্লাহ্ তা’আলা, তাঁর ফিরিশতাদের, কিতাব সমূহের, রাসূলগণের, ও শেষ দিবসের, এবং ভাগ্যের ভাল মন্দের প্রতি ঈমান আনা।

এ প্রসংগে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ.

[سورة البقرة: الآية 177]

অর্থঃ ((বরং প্রকৃতপক্ষে সত্কাজ হলো- ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কেয়ামত দিবসের উপর, ফিরিশতাদের উপর, এবং সমস্ত নবী-রাসূলগণের উপর))। [সূরা আল-বাক্বারা,আয়াত-১৭৭ ]

তিনি আরো বলেনঃ

كُلٌّ آَمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ……

[سورة البقرة: الآية 285]

অর্থঃ ‍((সবাই বিশ্বাস রাখে, আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবের প্রতি এবং তাঁর নবীদের প্রতি, তারা বলে আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না))। [সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-২৮৫] তিনি আরো বলেনঃ

إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ.

[سورة القمر: الآية 49]

অর্থঃ ((আমি প্রত্যেক বস্তুকে পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি))। [সূরা আল-ক্বামার, আয়াত-৪৯]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

الإيمان أن تؤمن بالله، وملائكته، وكتبه، ورسله، واليوم الآخر. وتؤمن بالقدر خيره .وشره

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((ঈমান হলো- তুমি আল্লাহ তা’আলা, তাঁর ফিরিশতাগণ, কিতাব সমূহ, রাসূলগণ ও শেষ দিবসের (আখেরাতের) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে। আরো বিশ্বাস রাখবে ভাগ্যের ভাল মন্দের প্রতি))। [মুসলিম শরীফ]

ঈমানের সংজ্ঞাঃ তা হলো মুখে বলা এবং অন্তরে বিশ্বাস করা ও বাস্তবে অঙ্গ-প্রতঙ্গের মাধ্যমে সম্পাদন করা। ঈমান আনুগত্যে বৃদ্ধি হয়, নাফারমানী ও অবাদ্ধতায় হ্রাস পায়। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آَيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ – الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ – أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَهُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ

[سورة الأنفال: الآية 2-4]

অর্থঃ ((প্রকৃত মু’মিন তারাই যখন তাদের নিকটে আল্লাহর নাম স্বরণীত হয় তখন তাদের অন্তর কেঁপে উঠে। আর যখন তাদের নিকট তাঁর আয়াত পঠিত হয় তখন তাদের ঈমান বর্ধিত হয়। তারা তাদের প্রভুর উপরেই ভরসা করে। আর যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, এবং আমার প্রদত্ত রুযী হতে (আল্লাহর পথে ) ব্যয় করে। তারাই হল সত্যিকার ঈমানদার।)) [সূরা আল-আনফাল,আয়াত-২-৪]

তিনি আরো বলেনঃ

وَمَنْ يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا

[سورة النساء: الآية 136]

অর্থঃ ((…এবং যে আল্লাহর প্রতি,ও তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাব সমূহের প্রতি, এবং রাসূলগণের প্রতি ও কেয়ামত দিবসের প্রতি, বিশ্বাস স্থাপন করেনা তারা চরম পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত-১৩৬] আর ঈমান যা মুখের দ্বারা সম্পাদিত হয়, যেমন- যিকির, দো’আ, ন্যায়ের আদেশ, অন্যায়ের নিষেধ ও কুরআন তিলাওয়াত করা ইত্যাদি।

অনুরূপভাবে, অন্তরের সাথেও ঈমান সংশ্লিষ্ট। যেমন- স্রষ্টা, প্রতিপালক, পরিচালক, ইবাদাতের অধিকারী এবং সুন্দরতম নাম ও মহান গুণাবলীর ক্ষেত্রে আল্লাহ তা’আলার তাওহীদ বা একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করা। এক ও অদিত্বীয় আল্লাহ তা’আলার দাসত্বের আবশ্যকতায় বিশ্বাস স্থাপন করা। ইচ্ছা-সংকল্প ইত্যাদি ও এর মধ্যে শামিল।

আর অন্তরের কাজ হলোঃ আল্লাহর ভালবাসা, ভয়-ভীতি, আশা-আগ্রহ ও ভরসা ইত্যাদি (সব কিছু অন্তরের ঈমান)। অঙ্গ-প্রতঙ্গের কর্ম সমূহ ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। যেমন- সালাত, সওম, হজ্জ, আল্লাহর পথে জিহাদ, দ্বীনী শিক্ষার্জন ইত্যাদি। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آَيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا

[سورة الأنفال: الآية 2]

অর্থঃ ((আর যখন তাদের কাছে তাঁর (আল্লাহর ) আয়াত পঠিত হয়, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায়।)) [সূরা আল-আনফাল, আয়াত-২] তিনি আরো বলেনঃ

هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَعَ إِيمَانِهِمْ

[سورة الفتح: الآية 4]

অর্থঃ ((তিনি মু’মিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করেন, যাতে তাদের ঈমানের সাথে আরো ঈমান বেড়ে যায়।)) [সূরা আল-ফাতহ্, আয়াত-৪]

সুতরাং আনুগত্য ও নৈকট্যশীলতা যত বৃদ্ধি পায়, ঈমানও তত বৃদ্ধি পায়। আর আনুগত্য ও নৈকট্যশীলতা যত হ্রাস পায়, ঈমানও তত হ্রাস পায়। যেমন- অবাধ্যতা ও নাফরমানী ঈমানে কু-প্রভাব ফেলে, যদি তা (নাফরমানী) বড় ধরনের শির্ক বা কোন কুফুরী কাজ হয় তাহলে আসল ঈমানকে ধ্বংস করে দিবে। আর যদি ছোট ধরণের কোন নাফরমানী হয় তাহলে ঈমানের পরিপূর্ণতায় ঘাটতি আসে এবং তা কলুষিত ও দুর্বল হয়ে যায়। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ

[سورة النساء: الآية 48]

অর্থঃ ((নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এতদ্ব্যতীত সব কিছু যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন।)) [সূরা আন্- নিসা, আয়াত-৪৮] তিনি আরো বলেনঃ

يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُوا وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ

[سورة التوبة: الآية 74]

অর্থঃ ((তারা কসম খেয়ে বলে যে আমরা বলি নাই। অথচ তারা কুফরী বাক্য বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণ করার পর কুফরী করেছে।)) [সুরা আত্-তাওবাহ্, আয়াত-৭৪] নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

لا يزني الزاني حين يزني وهو مؤمن، ولا يسرق السارق حين يسرق وهو مؤمن، ولا يشرب الخمر حين شربها وهو مؤمن.

[متفق عليه]

অর্থঃ ((ব্যভিচারী পরিপূর্ণ ঈমানদার অবস্থায় ব্যভিচারে লিপ্ত হয় না, চোর পরিপূর্ণ ঈমানদার অবস্থায় চুরি করেনা এবং মদ্যপায়ী পরিপূর্ণ ঈমানদার অবস্থায় মদ পান করেনা (অর্থাৎ, উক্ত সময়ে তাদের ঈমান অপূর্ণ ও দুর্বল হয়ে যায়)।)) [বুখারী ও মুসলিম]

প্রথমস্তম্ভ

الركن الأول: الإيمان بالله عزوجل

প্রথম স্তম্ভঃ মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান

() ঈমানের বাস্তবায়নঃ

নিম্নে বর্ণিত বিষয় সমূহ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমান আনা হয়।

প্রথমতঃ এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, এ বিশ্ব জগতের একজন প্রভু প্রতিপালক রয়েছেন। যিনি স্বীয় সৃষ্টি রাজত্ব, পরিচালনা ও কর্ম ব্যাবস্থাপনায় রিযিকদাতা, জীবন দাতা, মৃত্যুদাতা, ক্ষমতাশীল এবং কল্যাণ ও অকল্যাণ সাধনকারী হিসেবে এক ও অদ্বিতীয়। তিনি ব্যতীত কোন প্রভু প্রতিপালক নেই। তিনি একাই যা ইচ্ছা তা করেন, এবং যা চান তার হুকুম করেন। যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন, আবার যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। তাঁরই হাতে আসমান জমিনের রাজত্ব। তিনি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল ও জ্ঞাত রয়েছেন। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। সকল আদেশ তাঁরই এবং সর্ব প্রকার কল্যাণ তাঁরই হাতে, তাঁর কর্মসমূহে কোন শরীক নেই। তাঁর কর্মে তাঁকে কেহ পরাজয়কারী নেই। বরং মানব জাতি, জিন জাতি ও ফিরিশতা মণ্ডলী সহ সকল সৃষ্টজীব তাঁরই দাস বা বান্দা । তারা তাঁর রাজত্ব, শক্তি ও ইচ্ছা হতে বের হতে পারেন না। তাঁর কর্মসমূহ অগণিত কোন সংখ্যাই তা সীমাবদ্ধ করতে পারে না। এ সকল বৈশিষ্ট্যের তিনিই একমাত্র অধিকারী, তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি ব্যতীত কেউ এর (বৈশিষ্ট্যসমূহের) অধিকার রাখে না। এসব আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সহিত সম্পর্কিত ও সাব্যস্ত করা হারাম। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ * الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ …..

[سورة البقرة: الآيتان ২১-২২]

অর্থঃ ((হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ইবাদাত কর, যিনি তোমাদিগকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদিগকে সৃষ্টি করেছেন। তাতে আশা করা যায় যে, তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পারবে। যে পবিত্রসত্তা তোমাদের জন্য যমীনকে বিছানা আকাশকে ছাদ স্বরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসাবে।)) [সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-২১,২২] তিনি আরো বলেনঃ

قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَنْ تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

[سورة آل عمران، الآية 26]

অর্থঃ ((বলুন, হে আল্লাহ! আপনিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। আপনি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান করেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নেন এবং যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। আপনারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান।)) [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত-২৬] তিনি আরো বলেনঃ

وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُبِينٍ

[سورة هود، الآية: 6]

অর্থঃ ((আর পৃথিবীতে বিচরণশীল মাত্রই সকলের জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ তা’আলা নিয়েছেন, তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় সমাপিত হয়। সব কিছুই এক সুস্পষ্ট গ্রন্থে রয়েছে।)) [সূরা হুদ, আয়াত-৬] তিনি আরো বলেনঃ

أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

[سورة الأعراف، الآية: 54]

অর্থঃ ((জেনে রেখ, তাঁরই সৃষ্টি ও তাঁরই বিধান, আল্লাহ বরকতময় যিনি বিশ্ব জগতের প্রভু-প্রতিপালক।)) [সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত-৫৪ ]

দ্বিতীয়তঃ এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর সুন্দর নামসমূহ ও পবিত্র পূর্ণ গুণাবলীর ক্ষেত্রে এক ও অদ্বিতীয়। যার কিছু বান্দাদের জন্য তাঁর পবিত্র গ্রন্থ ও শেষ নবী ও নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

[سورة الأعراف، الآية: 180]

অর্থঃ ((আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সর্বোত্তম নাম। তাই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর, যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃত কর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।)) [সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত-১৮০] নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

(( إن لله تسعة وتسعين اسماً من أحصاها دخل الجنة، وهو وتر يحب الوتر))[متفق عليه]

অর্থঃ ((আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি ইহা সংরক্ষন করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আল্লাহ্ বেজোড়, তিনি বেজোড়কে ভালবাসেন।)) [বুখারী ও মুসলিম]

আর এই আকীদাহ-বিশ্বাস দু’টি বড় মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।

প্রথমঃ নিশ্চয় আল্লাহ্ সুন্দর নাম ও মহান গুণ রয়েছে, যা পরিপূর্ণ গুণাবলীর প্রমাণ করে, তাতে কোন প্রকারের অপরিপূর্ণতা ও ক্রটি নেই। সৃষ্টিজীবের কোন কিছুই তার মত ও তার অংশীদার হতে পারে না। الحيّ (আল-হাইয়ু) তাঁর (আল্লাহর) নামসমূহের একটি নাম। الحياة (আল-হায়াত) তাঁর সিফাত বা গুণ যা মহান আল্লাহর জন্য সমুচিত সঠিক পন্থায় সাব্যস্ত করা ওয়াজিব। আর এ জীবন এক চিরস্থায়ী পরিপূর্ণ জীবন। তাতে জ্ঞান, শক্তি ইত্যাদি সর্ব প্রকার পূর্ণতার সমাবেশ রয়েছে। আল্লাহ চিরঞ্জীব তাঁর লয় ও ক্ষয় নাই। আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ…

[سورة البقرة، الآية: 255]

অর্থঃ ((আল্লাহ্ ছাড়া কোন সঠিক উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব ও সব কিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রা স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়।)) [সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-২৫৫]

দ্বিতীয়ঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা সকল দোষ ও ক্রটিযুক্ত গুণ হতে সম্পূর্ণভাবে পবিত্র। যেমন- নিদ্রা, অপারগতা, মূর্খতা ও যুলুম-অত্যাচার ইত্যাদি।

তিনি আরো পবিত্র সৃষ্টিজীবের সাথে সাদৃশ্য রাখা হতে। আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর (আল্লাহর) জন্য যে সকল গুণ অস্বীকার করেছেন, তা অস্বীকার করা অতীব জরুরী। আল্লাহ্ তা’আলা যে সকল গুণকে নিজের জন্য অস্বীকার করেছেন সেসব গুণের বিপরীত গুণে পরিপূর্ণ ভাবে গুণাম্বিত; এই বিশ্বাস রাখা। সুতরাং যখন আল্লাহকে তন্দ্রা ও নিদ্রার দোষারোপ থেকে মুক্ত করব, তখন তন্দ্রার বিপরীত চির জাগ্রত এবং নিদ্রার বিপরীত চিরঞ্জীব পরিপূর্ণ দু’টি গুণকে সাব্যস্ত করা হবে। অনুরূপভাবে আল্লাহকে প্রতিটি অপরিপূর্ণ গুণ থেকে মুক্ত করলে সাথে সাথে তার বিপরীত পরিপূর্ণ গুণ সাব্যস্ত হয়ে যায়। তিনিই একমাত্র পরিপূর্ণ আর তিনি ব্যতীত সবই অপরিপূর্ণ। আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

……لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ

[سورة الشورى، الآية: 11]

অর্থঃ (( (সৃষ্টজীবের) কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। আর তিনি সব শুনেন এবং সব দেখেন।)) [সূরা আশ্-শূরা, আয়াত-১১] তিনি আরো বলেনঃ

….وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ

[سورة فصلت، الآية: 46]

অর্থঃ ((আর আপনার প্রতিপালক বান্দাদের প্রতি যুলুম করেন না।)) [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত-৪৬] তিনি আরো বলেনঃ

…..وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعْجِزَهُ مِنْ شَيْءٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ…..

[سورة فاطر، الآية: 44]

অর্থঃ ((আকাশ ও পৃথিবীতে কোন কিছুই আল্লাহকে অপারগ করতে পারে না।)) [সূরা ফাতের, আয়াত-৪৪] তিনি আরো বলেনঃ

وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيًّا.

[سورة مريم، الآية: 64]

অর্থঃ ((আর আপনার প্রতিপালক বিস্মৃত হওয়ার নন।)) [সূরা মারইয়াম, আয়াত-৬৪]

আল্লাহর নাম, তাঁর গুণ ও কর্ম সমূহের প্রতি ঈমান আনা, আল্লাহ্ ও তাঁর ইবাদাতকে জানার একমাত্র পথ।

কারণ আল্লাহ্ তা’আলা এই পার্থিব জগতে তাঁর সরাসরি দর্শনকে সৃষ্টিজীব হতে গোপন রেখেছেন, এবং তাদের জন্য এমন জ্ঞানের পথ খুলে দিয়েছেন, যার দ্বারা তারা তাদের প্রভু ইলাহ্-মা’বুদকে জানবে এবং সঠিক জ্ঞান অনুযায়ী তাঁর ইবাদাত করবে। সুতরাং বান্দা তার গুণময় মা’বুদের ইবাদাত করে, মুআত্তিল (আল্লাহর নাম ও গুণাবলী অধিকারকারী) অনস্তিত্বের ইবাদাত করে, মুমাচ্ছিল (মুশরিক সাদৃশ্যবাদী) প্রতিমার ইবাদাত করে। আর মুসলিম ব্যক্তি এক ও অমুখাপেক্ষী আল্লাহর ইবাদাত করে, যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি, এবং তাঁর সমকক্ষ ও কেউ নয়।

আল্লাহর সুন্দর নাম সমূহ সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে নিম্নে বর্ণিত বিষয় গুলোর লক্ষ্য রাখা উচিতঃ

(১) সংযোজন ও বিয়োজন ব্যাতীত কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত সকল সুন্দর নাম সমূহ আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত রয়েছে তার উপর ঈমান আনা। আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ

[سورةالحشر : 26]

অর্থঃ ((তিনিই আল্লাহ তিনি ব্যতীত সত্যিকার কোন উপাস্য নেই। তিনি এক মাত্র সব কিছুর মালিক, যাবতীয় দোষ-ক্রটি হতে পবিত্র,শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা, পর্যবেক্ষক,পরাক্রান্ত, প্রতাপাম্বিত, মাহাত্মশীল। তারা যাকে অংশীদার করে আল্লাহ তা’আলা তা থেকে পবিত্র।)) [সূরা আল-হাশর, আয়াত-২৩ ] হাদীসে এসেছেঃ

((وثبت في السنة أن النبي- r-سمع رجلاً يقول: اللهم إني أسألك بأن لك الحمد لا إله إلا أنت المنان بديع السموات، والأرض يا ذا الجلال ،والإكرام يا الحي يا القيوم. فقال النبي – r -: تدرون بما دعا الله؟ قالوا: الله، ورسوله أعلم، قال:والذي نفسي بيده لقد دعا الله باسمه الأعظم الذي إذا دعي به أجاب، وإذا سئل به أعطى))

[رواه أبو داود، وأحمد]

অর্থঃ ((নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন। হে আল্লাহ্ ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি, কারণ সকল প্রশংসা তোমারই জন্য। তুমি ছাড়া কোন সত্যিকার মা’বুদ নেই। তুমি (মান্নান ) অনুগ্রহকারী, আসমান জমিনের সৃষ্টি কারী। হে সম্মানিত ও মর্যাদাবান! হে চিরঞ্জীব ও সব কিছুর ধারক বাহক ! অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সাহাবাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ তোমরা কি জান ? সে কিসের (অসিলায়) আল্লাহকে আহ্বান করেছে? তাঁরা বললেনঃ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই অধিক জানেন। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ শপথ সেই সত্তার যার হাতে আমার প্রাণ, নিশ্চয় সে আল্লাহকে তাঁর এমন ইসমে আজমের (মহান নামের)অসিলায় আহ্বান করেছে,যার দ্বারা আল্লাহকে আহ্বান করলে আল্লাহ্ আহ্বানে সাড়া দেন, এবং আবেদন করলে তিনি দান করেন।)) [ ইমাম আবু দাউদ ও আহ্মাদ হাদীসটি বর্ণনা করেন]

(২) আল্লাহ্ নিজেই নিজের নাম রেখেছেন। সৃষ্টি জীবের কেউ তার নাম রাখে নাই। এবং তিনি নিজেই এই সকল নাম দ্বারা স্বীয় প্রশংসা করেছেন। ইহা সৃজিত নতুন নয়। ইহার উপর ঈমান আনা।

(৩) আল্লাহর সুন্দর নাম সমূহ এমন পরিপূর্ণ অর্থবোধক যাতে কোন প্রকারের কোন ক্রটি নেই। তাই এ নাম সমূহের প্রতি ঈমান আনা যেমন ওয়াজিব,তেমনি এর অর্থের উপর ঈমান আনাও ওয়াজিব।

(৪) এ সমস্ত নামের অর্থ অস্বীকার ও অপব্যাক্ষা না করে সম্মানের সাথে গ্রহণ করা ওয়াজিব।

(৫) প্রতিটি নাম হতে সাব্যস্ত বিধি-বিধান ও ফলাফল এবং এর প্রভাবের প্রতি ঈমান আনা।

এ পাঁচটি বিষয়কে আরো স্পষ্ট করার জন্য আমরা আল্লাহর নাম السميع আসসামী'(শ্রবণ কারী) দ্বারা উদাহরণ পেশ করবো।

السميع এতে নিম্নে বর্ণিত বিষয় গুলো লক্ষ্য রাখা প্রত্যেকেরই কর্তব্য।

(ক) السميع (আস্সামী’) আল্লাহর নাম সমূহের একটি নাম। এ কথার প্রতি ঈমান আনা। কারণ এর বর্ণনা কুরআন ও হাদীসে এসেছে।

(খ) আরো ঈমান আনা যে,আল্লাহ্ তা’আলা নিজেই নিজেকে এ নামে নাম করণ করেছেন,এ নামে কথা বলেন এবং তা কুরআনে অবতীর্ণ করেছেন।

(গ) السميع (আস্সামী’) আস্সামউ বা (শোনা) অর্থকে শামিল করে। যা আল্লাহর গুণ সমূহের একটি গুণ।

(ঘ) السميع (আস্সামীয়) নাম হতে উদ্ভূত “শ্রবণ করা বা শোনা” গুনটি অস্বীকার ও অপব্যাখা না করে সম্মানের সাথে গ্রহণ করা ওয়াজিব।

(ঙ) নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু শুনেন এবং তাঁর শুনা সকল ধনিকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে, এই বিশ্বাস রাখা। এ ঈমানের ফলাফল ও প্রভাব হলো আল্লাহর পর্যবেক্ষণ ও তাঁর ভয়-ভীতি আবশ্যক হয়ে যায়,এবং এ দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হয় যে,আল্লাহর কাছে কোন কিছু গোপন থাকেনা।

এমনি ভাবে আল্লাহর গুণ العَِلي(আল-আলী) সাব্যস্ত করার সময় নিম্নের বিষয় গুলো লক্ষ্য রাখা উচিতঃ

(১) কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত সকল সিফাত বা গুণ কোন প্রকার অপব্যাখা ও সঠিক অর্থ ত্যাগ না করে প্রকৃতার্থে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা।

(২) দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ্ তা’আলা যাবতীয় দোষ অসম্পূর্ণ গুণ হতে মূক্ত, বরং তিনি সূ-পরিপূর্ণ গুণে গুনাম্বিত।

(৩) আল্লাহর গুণাবলীর সাথে সৃষ্টিজীবের গুণ সমূহের সাদৃশ্য না করা। কারণ আল্লাহর অনুরুপ কোন কিছু নেই। না তাঁর গুণে এবং না তাঁর কর্মে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

فَاطِرُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ جَعَلَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجاً وَمِنَ الْأَنْعَامِ أَزْوَاجاً يَذْرَؤُكُمْ فِيهِ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ

[سورة الشورى، الآية: 11]

অর্থঃ (((সৃষ্টিজীবের) কোন কিছুই তাঁর অনুরুপ নয়। আর তিনি সব শুনেন,এবং সব দেখেন।)) [সূরা আশ্শুরা,আয়াত-১১ ]

(৪) এসব গুণের রুপ ও ধরণ-গঠন জানার কোন প্রকার আশা আকাঙ্খা না করা। কেননা আল্লাহ গুণের রুপ ও ধরণ-গঠন তিনি ব্যতীত অন্য কেউ জানেনা। ফলে সৃষ্টিজীবের তা জানার কোন পথ নেই।

(৫) এ সব গুণাবলী হতে সাব্যস্ত বিধি-বিধান এবং এর প্রভাব ও দাবীর প্রতি ঈমান আনা। সুতরাং প্রতিটি গুণের সাথে ইবাদাত সম্পৃক্ত।

এখন পাঁচটি বিষয় আরো স্পষ্ট হওয়ার জন্য সিফাতুল ইস্তিওয়া الاستواء এর উদাহরণ পেশ করব।

আল-ইস্তিওয়া الاستواء গুণটি সাব্যস্ত করতে নিম্নে বর্ণিত বিষয় গুলো লক্ষ্য রাখা অপরিহার্য।

(১)আল-ইস্তিওয়া (আল্লাহ্ তা’আলা স্ব-সত্তায় আরশের উপরে রয়েছেন) এ গুণটি আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা এবং এর প্রতি ঈমান আনা, কেননা ইহা কুরআন ও হাদীসে একাধিকবার প্রমানিত হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى

[سورة طه، الآية: 5]

অর্থঃ ((পরম দয়াময় (আল্লাহ্ তা’আলা স্ব-সত্তায়) আরশের উপর রয়েছেন।)) [সূরা ত্বহা,আয়াত-৫]

(২) আল-ইস্তিওয়া الاستواء গুণটিকে যথাযোগ্য ও পরিপূর্ণ রূপে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা। আর এর প্রকৃত অর্থ হলোঃ আল্লাহ তা’আলা স্বীয় আরশের উপরে বিরাজমান রয়েছেন, যেমন তাঁর মহত্বের ও শ্রেষ্টত্বের শোভা পায়। এর অর্থ আল্লাহ তাঁর আরশের উপরে সমাসীন প্রকৃত পক্ষে। তাঁর মর্যাদার জন্য যে ভাবে শোভা পায়।

(৩) আল্লাহ তা’আলার আরশের উপর বিরাজমান থাকাকে সৃষ্টি জীবের আসন গ্রহণের সাথে উপমা না দেওয়া। কেননা আল্লাহ আরশের মুখাপেক্ষী নন। তিনি আরশের মুহ্তাজ নন। কিন্তু সৃষ্টি জীবের সমাসীনতা সম্পূর্ণ সতন্ত্র, সৃষ্টিজীব এর মুহ্তাজ বা মুখাপেক্ষী। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ

[سورة الشورى، الآية: 11]

অর্থঃ(( (সৃষ্টি জীবের) কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। আর তিনি সব শুনেন,এবং সব দেখেন।)) [সূরা আশ্শুরা, আয়াত-১১ ]

(৪) আল্লাহ তা’আলার আরশের উপর বিরাজমানের ধরণ ও পদ্ধতি নিয়ে তর্কে লিপ্ত না হওয়া। কেননা এটা গাইবী (অদৃশ্যের) বিষয়, যা একমাত্র আল্লাহ তা’আলা ছাড়া কেউ জানেনা।

(৫) এ গুণটি হতে সাব্যস্ত বিধি-বিধান ও ফলাফল এবং এর প্রভাবের প্রতি ঈমান আনা, আর তা হলো আল্লাহ্ তা’আলার যথাযোগ্য মহত্ত ও শ্রেষ্টত্ব সাব্যস্ত করা, যা সমগ্র সৃষ্টি হতে তাঁর উর্দ্ধে ও সু-উচ্চে (আরশের উপর) অবস্থানই প্রমাণ করে।

আরো প্রমাণ করে সকল আত্মার তাঁরই দিকে ঊর্ধমূখী হওয়া, যেমন সিজ্দাকারী সিজ্দায় বলেঃ سبحان ربي الأعلى আমি আমার প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করি যিনি সু-উচ্চ ও ঊর্ধে।

তৃতীয়তঃ এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ্ তা’আলাই একমাত্র সত্যিকার মা’বুদ বা উপাস্য এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যাবতীয় ইবাদাত পাওয়ার অধিকার রাখেন। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শরীক নেই। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُواْ اللّهَ وَاجْتَنِبُواْ الطَّاغُوتَ

[سورة النحل، الآية: 36]

অর্থঃ ((আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করবে এবং তাগূত (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদাত করা মানে, শির্ক করা) থেকে নিরাপদ ও বিরত থাকবে।)) [সূরা আন-নহল, আয়াত-৩৬] আর প্রত্যেক রাসূলই স্বীয় উম্মাতকে বলতেনঃ

اعْبُدُواْ اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَـهٍ غَيْرُهُ

[سورة الأعراف، الآية: 59]

অর্থঃ ((তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন সত্য উপাস্য নেই।)) [সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত-৫৯] তিনি আরো বলেনঃ

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاء

[سورة البينة، الآية: 5 ]

অর্থঃ ((আর তাদেরকে এ ছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠ ভাবে (শির্কমুক্ত থেকে) একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করবে।)) [সূরা আল-বাইয়্যেনাহ-আয়াত-৫] সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে,

أتدري ما حق الله على العباد وما حق العباد على الله؟.قلت:الله ورسوله أعلم.قال:حق الله على العباد أن يعبدوه ولا يشركوا به شيئاً،وحق العباد على الله ألا يعذب من لا يشرك به شيئاً

অর্থঃ ((তুমি কি জান? বান্দার উপর আল্লাহর হক্ব বা অধিকার কি? আর আল্লাহর উপর বান্দার অধিকার কি? আমি (মু’য়াজ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) বললামঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ বান্দার উপর আল্লাহর হক্ব হলো- তাঁর (আল্লাহর) ইবাদাত করা, এবং তাঁর সাথে কাউকে অংশীদার না করা। আল্লাহর উপর বান্দার হক্ব হলো- যারা তাওহীদের উপর থেকে শির্ক মুক্ত থাকে তাদেরকে শাস্তি না দেওয়া।))

সত্য মাবুদঃ তিনিই সত্য মা’বুদ, অন্তর যার ইবাদাত করে, যার ভালবাসায় অন্তর ভরে যায়, অন্যের ভালবাসার প্রয়োজন পড়েনা। যার আশা আকাংখাই অন্তরের জন্য যথেষ্ট অন্যের কাছে আশা ও আকাংখার প্রয়োজন হয়না। যার নিকট চাওয়া পাওয়া, সাহায্য প্রার্থনা ও তাঁকে ভয়-ভীতি করাই অন্তরের জন্য যথেষ্ট। অন্য কারো কাছে চাওয়া পাওয়ার প্রার্থনা করা, কাউকে ভয়-ভীতি করার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِن دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ

[سورة الحج، الآية: 62]

অর্থঃ ((এটা একারণেও যে, আল্লাহই সত্যঃ আর তাঁর পরিবর্তে তারা যাকে ডাকে,তা অসত্য এবং আল্লাহই সবার উচ্চে, মহান।)) [সূরা আল-হাজ্জ,আয়াত-৬২ ]

আর ইহাই বান্দার কর্মের দ্বারা আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষনা করা। ইহাই তাওহীদে উলুহীয়্যাহ্।

তাওহীদের গুরুত্বঃ নিম্নের বিষয় গুলোর মাধ্যমে তাওহীদের গুরুত্ব ফুটে উঠে।

(১) তাওহীদই ইসলাম ধর্মের শুরু ও শেষ, জাহেরী-বাতেনী-এবং মুখ্য উদ্দেশ্য। আর ইহাই সকল রাসূল ‘আলাইহিস্ সালামের দাওয়াত ছিল।

(২) এ তাওহীদ (কায়েম) এর লক্ষ্যে-আল্লাহ্ তা’আলা মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন, সকল নবী রাসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং সব আসমানী কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আর এ তাওহীদের কারণেই মানুষ মু’মিন-কাফির, সৌভাগ্য দূর্ভাগ্যে বিভক্ত হয়েছে।

(৩) আর তাওহীদই বান্দাদের উপর সর্ব প্রথম ওয়াজিব। সর্ব প্রথম এর মাধ্যমেই ইসলামে প্রবেশ করে। এবং এ তাওহীদ নিয়েই দুনিয়া ত্যাগ করে।

তাওহীদ বাস্তবায়ন বা তাওহীদ প্রতিষ্ঠাঃ তাওহীদের বাস্তবায়ন হলঃ তাওহীদকে শির্ক, বিদ্আত ও পাপাচার মুক্ত করা।

তাওহীদকে কলুষ মুক্ত করা দুরকমঃ

(১) ওয়াজিব ও

(২) মান্দুব বা মুস্তাহাব।

ওয়াজিব তাওহীদ তিন বিষয়ের মাধ্যমে হয়ঃ

(১) তাওহীদকে এমন শির্ক, হতে মুক্ত করা, যা মূল তাওহীদের পরিপন্থী।

(২) তাওহীদকে এমন বিদ্আত হতে মুক্ত করা যা তাওহীদের পরিপূর্ণতার পরিপন্থী,অথবা মূল তাওহীদের পরিপন্থী সে বিদ্আত যদি কুফুরী পর্যায়ের হয়ে থাকে।

(৩) তাওহীদকে এমন পাপকর্ম হতে মুক্ত করা যা তাওহীদের (অর্জিত) পূণ্য হ্রাস করে এবং তাওহীদে কু-প্রভাব ফেলে।

আর মান্দুব (তাওহীদ) তা হলো মুস্তাহাব কাজ। যেমন নিম্নরুপঃ

(ক) ইহ্সানের (ইখলাসের) পূর্ণ বাস্তবায়ন।

(খ) ইয়াকীনের পূর্ণ বাস্তবায়ন করা।

(গ) আল্লাহ ছাড়া কারো নিকট অভিযোগ না করে পূর্ণ ধৈর্য ধারণ করা।

(ঘ) সৃষ্টি জীব হতে মুক্ত হয়ে শুধু মাত্র আল্লাহর কাছে চাওয়াই যথেষ্ঠ মনে করা।

(চ) কিছু বৈধ উপকরণ ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলের প্রকাশ। যেমন-ঝাড় ফুঁক ও দাগা (রোগ নিরাময়ের জন্য) ছেড়ে দেওয়া।

(ছ) নফল ইবাদাত করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যমে পূর্ণ ভালবাসা লাভ করা।

অতঃপর যারা তাওহীদকে বাস্তবায়ন করবে উপরে বর্ণনানুপাতে এবং বড় শির্ক হতে বেঁচে থাকবে, তারা জাহান্নামে চিরস্থায়ী বসবাস করা হতে পরিত্রান লাভ করবে। আর যারা বড় ও ছোট শির্ক করা হতে বেঁচে থাকবে এবং বড় ও ছোট পাপ হতে দূরে থাকবে, তাদের জন্য দুনিয়াতে ও আখিরাতে পূর্ণ নিরাপত্তা রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

إِنَّ اللّهَ لاَ يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ

[سورة النساء، الآية: 48]

অর্থঃ ((নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা তাঁর সাথে শির্কের অপরাধ ক্ষমা করবেন না। আর ইহা ব্যতীত যাকে ইচ্ছা করেন (তার অন্যান্য অপরাধ) ক্ষমা করে দেন।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত,৪৮ ] তিনি আরো বলেনঃ

الَّذِينَ آمَنُواْ وَلَمْ يَلْبِسُواْ إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُوْلَـئِكَ لَهُمُ الأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ

[سورة الأنعام، الآية: 82]

অর্থঃ ((যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে শির্কের সাথে মিশ্রিত করেনা,তাদের জন্যই শান্তি এবং তারাই সুপথগামী।)) [সূরা-আল- আনআম,আয়াত-৮২]

তাওহীদের বিপরীত শির্ক, ইহা তিন প্রকারঃ

() বড় শির্কঃ যা মূল তাওহীদের পরিপন্থী, আল্লাহ্ শির্কের গোনাহ্ তাওবাহ্ ছাড়া মাফ করেননা। যে ব্যক্তি শির্কের উপর মারা যাবে, সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে।

শির্ক লোঃ আল্লাহর ইবাদাতে কাউকে তাঁর সমকক্ষ নিধর্ারণ করে নেয়া। যেমন ভাবে আল্লাহকে ডাকে অনুরূপ ভাবে তাকে (সমকক্ষকে) ডাকা। তাকে উদ্দেশ্য করা, তার উপর ভরসা করা। তার কাছে কোন কিছুর আশা করা। তাকে ভালবাসা তাকে ভয় করা, যেরুপ আল্লাহকে ভালবাসে ও ভয় করে। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللّهُ عَلَيهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ

[سورة المائدة، الآية: 72]

অর্থঃ ((নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে আংশিদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করেছেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের (মুশরীকদের) কোন সাহায্যকারী নেই।)) [সূরা আল-মায়িদাহ-আয়াত-৭২ ]

() ছোট শির্কঃ তাওহীদের পূর্ণতার পরিপন্থী। ইহা প্রত্যেক ঐ মাধ্যম যা বড় শির্কের দিকে নিয়ে যায়। যেমন আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা। রিয়া বা লোক দেখানো কাজ।

() গোপন শির্কঃ যা নিয়্যাত ও উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্ত রাখে। ইহা কখনো ছোট, আবার কখনো বড় শির্কে পরিনত হয়। সাহাবী মাহমুদ বিন লবীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

إن أخوف ما أخاف عليكم الشرك الأصغر،قالوا وماالشرك الأصغر يارسول الله ؟ قال:الرياء

[رواه الإمام أحمد]

অর্থঃ ((আমি তোমাদের উপর সব চেয়ে বেশী ভয় পাই ছোট শির্কের। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! ছোট শির্ক কি? তিনি বল্লেনঃ তা হল রিয়া বা লোক দেখানো কাজ।)) [আহমাদ]

() ইবাদাতের সংজ্ঞাঃ ইহা ঐ সব আকীদা-বিশ্বাস, অন্তর ও অঙ্গ-প্রতঙ্গের কর্ম যা আল্লাহ্ তা’আলা ভাল বাসেন ও পছন্দ করেন। ইহা ছাড়া কোন কিছু সম্পাদন করা বা বর্জন করা যা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করায় তাও ইবাদাত। অনুরূপভাবে কুরআন ও হাদীসে বিধিবদ্ধ্য প্রতিটি কর্ম ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত। ইবাদাত বিভিন্ন প্রকারের রয়েছে।

আন্তরিক ইবাদাতঃ যেমন- ঈমানের ছয়টি রুকন, ভয়, আশা, ভরসা, আগ্রহ, ও ভিতী, ইত্যাদি।

প্রকাশ্য ইবাদাতঃ যেমন- সালাত, যাকাত, সওম ও হজ্জ।

ইবাদাত ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ যোগ্য হবে না যতক্ষণ না তা দু’টি মূল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রথমঃ সকল ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর জন্য খালেস করা এবং তার সাথে শির্ক না করা। আর ইহাই شهادة أن لا إله إلا الله “আল্লাহ্ ছাড়া কোন সত্য মা’বুদ নেই” এ শাক্ষ্য প্রদানের অর্থ। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاء مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ

[سورة الزمر، الآية: 3]

অর্থঃ ((জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদাত আল্লাহরই নিমিত্তে। যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্য রূপে গ্রহণ করে রেখেছে এবং বলে যে, আমরা তাদের ইবাদাত এজন্যই করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে তাদের পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফায়সালা করে দেবেন। আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফিরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।)) [সূরা আয্-যুমার,আয়াত-৩] তিনি আরো বলেনঃ

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاء

[سورة البينة، الآية: 5]

অর্থঃ ((আর তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশকরা হয়নি যে,তারা খাঁটি মনে একনিষ্টভাবে (শির্কমুক্ত থেকে) একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করবে।)) [সূরা আল-বাইয়্যেনাহ-আয়াত-৫]

দ্বিতীয়ঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে, শরীয়াত নিয়ে এসেছেন তার অনুসরণ করা। এর অর্থ, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে কাজ যে ভাবে করেছেন সে কাজ সেই নিয়মে করা, কোন প্রকার কম বেশী না করা। আর ইহাই شهادة أن محمدًا رسول الله “মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রেরিত রাসূল” এ সাক্ষ্য প্রদানের অর্থ। আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ

[سورة آل عمران، الآية: 31]

অর্থঃ ((বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভাল বাস,তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহও তোমাদিগকে ভাল বাসেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন,আর আল্লাহ্ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু।)) [সূরা আলি-ইমরান,আয়াত-৩১ ] তিনি আরো বলেনঃ

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا

[سورة الحشر، الآية: 7]

অর্থঃ ((আর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা গ্রহণ কর, এবং যা থেকে বারণ করেছেন তা হতে বিরত থাক।)) [সূরা আল-হাশর,আয়াত-৭] তিনি আরো বলেনঃ

فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُونَ حَتَّىَ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لاَ يَجِدُواْ فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجاً مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسْلِيماً

[سورة النساء، الآية: 65]

অর্থঃ ((অতএব তোমার পালন কতর্ার কসম, তারা ঈমানদার হবে না, যতক্ষন পযনর্্ত তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায় বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নিবে।)) [সূরা আন্-নিসা,আয়াত-৬৫]

দুটি বিষয় ছাড়া ইবাদাত (দাসত্ব) পরিপূর্ণতা লাভ করেনাঃ

প্রথমঃ আল্লাহকে পূর্ণ ভালবাসা, অর্থাৎ, আল্লাহর ভালবাসা ও আল্লাহ যা ভাল বাসেন তাঁর ভালবাসাকে অন্য সকল বস্তুর ভালবাসার উপর প্রাধান্য দেওয়া।

দ্বিতীয়ঃ আল্লাহর নিকট পূর্ণ বিনয়-নম্রতা ও আনুগত্য প্রকাশ করা। অর্থাৎ, বান্দা আল্লাহ তা’আলার আদেশ সমূহ পালনের ও নিষেধাগ্যা হতে বেঁচে থাকার মাধ্যমে বিনয়-নম্রতা প্রকাশ করবে।

সুতরাং পূর্ণ বশ্যতা, বিনয়-নম্রতা, আশা-আকাঙ্খা ও ভয়-ভীতির সাথে পূর্ণ ভালবাসাকে ইবাদাত বলা হয়। এর মাধ্যমেই বান্দার ইবাদাত স্বীয় প্রভু সৃষ্টি কর্তার জন্য বাস্তবায়িত হয়। আল্লাহর জন্য ইবাদাত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ভালবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হয়। অতএব বান্দার ফরজ বিধান পালন করার মাধ্যমে তাঁর (আল্লাহর ) নৈকট্য অর্জন করাকে আল্লাহ্ ভালবাসেন। বান্দার নফল ইবাদাত যতই বৃদ্ধি পাবে ততই তাঁর নৈকট্য ও মর্যাদা আল্লাহর নিকট বৃদ্ধি পাবে। আর আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুনায় ইহা জান্নাতে প্রবেশ করার উপায় হবে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

ادْعُواْ رَبَّكُمْ تَضَرُّعاً وَخُفْيَةً إِنَّهُ لاَ يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ

[سورة الأعراف، الآية: 55]

অর্থঃ ((তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাক, কাকুতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা- অতিক্রমকারীদেরকে পছন্দ করেন না।)) [সূরা আল-আ’রাফ,আয়াত-৫৫]

() আল্লাহর তাওহীদ (একতাত্ববাদ) এর দলীল প্রমাণ পঞ্জীঃ

আল্লাহ্ তা’আলার একত্ববাদের স্বপক্ষে অজশ্র সাক্ষ্য ও প্রমাণ পঞ্জী রয়েছে। যারা এ প্রমাণ পঞ্জীকে নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করবে, তাদের জ্ঞান ও বিশ্বাস আল্লাহ তা’আলার কর্ম, নাম ও গুনাবলী এবং ইবাদাতের ক্ষেত্রে একত্ববাদকে আরো বৃদ্ধি ও দৃঢ় করবে।

নিম্নে সে সকল সাক্ষ্য ও প্রমাণ-পঞ্জীর কিছু নমুনা পেশ করা হলোঃ

(ক) এ পৃথিবী সৃষ্টির বিশালতা, সূক্ষ্ন কারীগরী,রকমারী সৃষ্টি এবং এসব পরিচালনার সুদক্ষ নিয়ম-নীতি। যে ব্যক্তি এ সমস্ত বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করবে আল্লাহ তা’আলার একত্ববাদ সম্পর্কে তার একিন-বিশ্বাস আরো দৃঢ় হবে। তেমনি যে নভোমন্ডল-ভূমন্ডল,সূর্য-চন্দ্র, মানুষ-পশু, উদ্ভিদ-লতাপাতা ও জড় পদার্থ সম্পর্কে চিন্তা করবে, সে নিশ্চিত ভাবে জানতে পারবে যে, এসবের এক জন স্রষ্টা রয়েছেন, যিনি স্বীয় নামসমূহ, গুনাবলী ও উপাস্য পরিপূর্ণ আর ইহাই প্রমাণ করে যে, তিনিই একমাত্র যাবতীয় ইবাদাত পাওয়ার প্রকৃত অধিকার রাখেন। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

وَجَعَلْنَا فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَن تَمِيدَ بِهِمْ وَجَعَلْنَا فِيهَا فِجَاجاً سُبُلاً لَعَلَّهُمْ يَهْتَدُونَ – وَجَعَلْنَا السَّمَاء سَقْفاً مَّحْفُوظاً وَهُمْ عَنْ آيَاتِهَا مُعْرِضُونَ – وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ

[سورة الأنبياء، الآيات: 31-33]

অর্থঃ ((আমি পৃথিবীতে ভারী বোঝা রেখে দিয়েছি যাতে তাদেরকে নিয়ে পৃথিবী ঝুঁকে না পড়ে এবং তাতে প্রশস্ত পথ রেখেছি, যাতে তারা পথ প্রাপ্ত হয়। আমি আকাশকে সুরক্ষিত ছাদ করেছি, অথচ তারা আমার আকাশস্ত নিদর্শনাবলী থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। সবাই আপন কক্ষপথে বিচরণ করে।))[সূরা আল-আম্বিয়া,আয়াত-৩১-৩৩] তিনি আরো বলেনঃ

وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّلْعَالِمِينَ

[سورة الروم، الآية: 22]

অর্থঃ ((তাঁর (আল্লাহর) আরও এক নিদর্শন হচ্ছে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র! নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।)) [সূরা আর-রূম,আয়াত-২২]

(খ) আল্লাহ তা’আলা রাসূলদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহিমুস সালাম) যে শরীয়াত দিয়ে প্রেরণ করেছেন এবং তাদেরকে বিভিন্ন নিদর্শন ও অকাট্য প্রমাণাদি দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। এসব প্রমাণ করে যে, আল্লাহ্ তা’আলা এক ও অদ্বিতীয়। তিনি একমাত্র যাবতীয় ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য। আর আল্লাহ্ তা’আলা সৃষ্টিজীবের জন্য যে সব নিয়ম-বিধান প্রনয়ণ করেছে,তা প্রমাণ করে যে, এসব সেই বিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময় হতে এসেছে সৃষ্টিজীবের যাবতীয় কল্যাণ সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ

[سورة الحديد، الآية: 25]

অর্থঃ ((আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও মিযান বা মানদন্ড যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।)) [সূরা আল-হাদীদ,আয়াত-২৫] তিনি আরো বলেনঃ

قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَن يَأْتُواْ بِمِثْلِ هَـذَا الْقُرْآنِ لاَ يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيراً

[سورة الإسراء، الآية: 88]

অর্থঃ ((বলুনঃ যদি মানব ও জ্বীন এই কুরআনের অনুরূপ রচনা করে আনয়নের জন্য এক হয় এবং তারা পরস্পরের সাহায্যকারী হয়, তবুও তারা কখনও এর অনুরূপ রচনা করে আনতে পারবে না।)) [সূরা আল-ইসরা,আয়াত-৮৮]

(গ) ফিৎরাত (সৃষ্টিগত স্বভাব বা প্রকৃতি) যার উপর আল্লাহ্ তা’আলা বান্দাদের আত্মাসমূহকে সৃষ্টি করেছেন, তা আল্লাহর একত্ববাদকে স্বীকার করে। ফিত্রাত অন্তরের স্থায়ী জিনিস, তাই যখন কোন মানুষ কষ্ট পায় তখন তা অনুভব করতে পারে, এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। মানুষ যদি সন্দেহ ও প্রবৃত্তির অনুসরণ মুক্ত হয় যা ফিৎরাতকে পরির্বতন করে দেয় তবে সে অন্তরস্থল থেকে নাম, গুণ, ও ইবাদাত প্রাপ্য, একমাত্র আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি দিবে এবং আল্লাহ তা’আলা রাসূলদেরকে যে শরীয়াত দিয়ে প্রেরণ করেছে তাতে আত্মসমর্পন করবে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفاً فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ – مُنِيبِينَ إِلَيْهِ وَاتَّقُوهُ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ

[سورة الروم، الآيتان: 30-31]

অর্থঃ ((তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি,যার উপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন,আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই সঠিক ধর্ম। কিন্ত অধিকাংশ মানুষ জানেনা। সকলেই তাঁর অভিমুখী হও এবং ভয় কর, সালাত কায়েম কর এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়োনা।)) [সূরা আর-রূম, আয়াত ৩০-৩১] নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

كل مو لد يولد على الفطرة ،فأبواه يهودانه، أو ينصرانه، أو يمجسانه، كما تنتج البهيمة بهيمة جمعاء هل تحسنون فيها من جدعاء

অর্থঃ ((প্রত্যেক শিশুই ফিৎরাতের উপর জন্ম গ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী, খৃষ্টান, অথবা অগ্নী পূজক বানায়। যেমন নিখুঁত জানোয়ার নিখুঁত বাঁচ্চা জন্ম দেয়। তাতে কোন প্রকার ক্রটি থাকেনা।)) অতঃপর এই আয়াত পাঠ করলেনঃ

فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا

[سورة الروم الآية : ৩০]

অর্থঃ ((এটাই আল্লাহর প্রকৃতি,যার উপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন।)) [সূরা আর-রূম,আয়াত-৩০]

দ্বিতীয়স্তম্ভ

الركن الثاني: الإيمان بالملائكة

দ্বিতীয় রুকনঃ ফিরিশতাদের প্রতি ঈমান

() ফিরিশতাদের পরিচয়ঃ

ফিরিশতাদের প্রতি ঈমানঃ দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ্ তা’আলার অনেক ফিরিশতা রয়েছেন। তিনি তাদেরকে নূর (জ্যোতি) হতে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টিগতভাবে তারা আল্লাহর অনুগত। তারা কখনও আল্লাহর আদেশের অবাধ্য হননা, বরং যা আদিষ্ট হন তা পালন করেন। তারা দিবা রাত্রি আল্লাহর তাসবীহ্ (পবিত্রতা) বর্ণনায় রত, কখনও ক্লান্ত হননা। তাদের সংখ্যা আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত কেউ জানেনা। আর আল্লাহ তাদেরকে বিভিন্ন প্রকার (কর্মের) দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

وَلَـكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَالْمَلآئِكَةِ

[سورة البقرة، الآية: 177]

অর্থঃ ((বরং বড় সত্কাজ হলো এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কিয়ামত দিবসের উপর, এবং ফিরিশতাদের উপর।)) [সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-১৭৭] তিনি আরো বলেনঃ

كُلٌّ آمَنَ بِاللّهِ وَمَلآئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لاَ نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ

[سورة البقرة، الآية: 285]

অর্থঃ ((সকলেই বিশ্বাস রাখেন আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থ সমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি।)) [সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-২৮৫] জিব্রাঈল ‘আলাইহিস্ সালামের প্রসিদ্ধ হাদীসে এসেছেঃ যখন তিনি (জিব্রাঈল) আল্লাহর রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-ঈমান, ইসলাম,ও ইহসান,সম্পর্কে। তিনি (জিব্রাঈল) বলেনঃ আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবগত করুণ। তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

أن تؤمن بالله وملائكته وكتبه ورسله واليوم الآخر وأن تؤمن بالقدر خيره وشره

অর্থঃ ((ঈমান হলোঃ আল্লাহ তাঁর ফিরিশতাদের, তাঁর কিতাব সমূহ, তাঁর রাসূলগণ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনা, এবং ভাগ্যের ভাল-মন্দের প্রতি ঈমান আনা।))

ইসলাম ধর্মে ফিরিশতাদের প্রতি ঈমানের স্থান তার বিধানঃ ফিরিশতাদের প্রতি ঈমান আনা, ঈমানের ছয়টি রুকনের দ্বিতীয় রুকন বা স্তম্ভ। ফিরিশতাদের প্রতি ঈমান আনা ছাড়া কোন ব্যক্তির ঈমান সঠিক ও গ্রহণ যোগ্য হবেনা। সম্মানিত ফিরিশতাদের প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব হওয়ার উপর সকল মুসলমান একমত । যারা সকল ফিরিশতাদের অথবা তাঁদের আংশিকের অস্তিত্বকে যাদের কথা আল্লাহ্ উল্লেখ করেছেন, অস্বীকার করবে তারা কুফুরী করলো, এবং কুরআন, হাদীস ও ইজমার বিরোধিতা করলো। আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

وَمَن يَكْفُرْ بِاللّهِ وَمَلاَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلاَلاً بَعِيداً

[سورة النساء، الآية: 136]

অর্থঃ ((যে আল্লাহ্ তা’আলাকে, তাঁর ফিরিশতাদেরকে, তাঁর কিতাব সমূহকে এবং তাঁর রাসূলগণকে ও কিয়ামত দিবসকে অস্বীকার করবে, সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহুদূরে গিয়ে পড়বে।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত-১৩৬]

() ফিরিশতাদের প্রতি ঈমান আনার পদ্ধতিঃ ফিরিশতাদের প্রতি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত ভাবে ঈমান আনা। সংক্ষিপ্ত ঈমান নিম্নের বিষয় গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে।

প্রথমঃ -তাদের অস্তিত্বের স্বীকার করা, তারা আল্লাহর সৃষ্টি জীব, আল্লাহ্ তাদেরকে তাঁর ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাদের অস্তিত্ব প্রকৃত, তাদেরকে আমাদের না দেখা, তাদের অনুস্তিত্বের অর্থ নয়, কারণ পৃথিবীতে অনেক সূক্ষ্ম সৃষ্টিজীব রয়েছে, তাদেরকে আমরা দেখতে পাইনা, অথচ তারা প্রকৃত পক্ষ্যে রয়েছে।

-নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিব্রাঈল আলাইহিস সালামকে তাঁর প্রকৃত আকৃতীতে দু’বার দেখেছেন।

-কতিপয় সাহাবী কিছু ফিরিশতাদেরকে মানুষের আকৃতীতে দেখেছেন।

-ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল তার মুসনাদে আব্দুল্লাহ্ বিন মাসউদ হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম কে তাঁর নিজস্ব আকৃতীতে ছয় শত পাখা বিশিষ্ট অবস্থায় দেখেছেন। প্রত্যেক পাখা একেক প্রান্ত ঢেকে রেখেছে।

-জিব্রাঈলের ‘আলাইহিস্ সালাম প্রসিদ্ধ হাদীস যা ইমাম মুসলিম (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন, তাতে প্রমাণিত হয় যে, জিব্রাঈল ‘আলাইহিস্ সালাম মানুষের আকৃতীতে ধপধপে সাদা পোষাকে, মিশ মিশ কালো চুলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসেছিলেন। তাঁর উপর ভ্রমণের কোন নিদর্শন ছিলনা। সাহাবাদের কেহ তাঁকে চিনতে পারে নাই।

দ্বিতীয়ঃ আল্লাহ্ তাদেরকে যে সম্মান দিয়েছেন, তাদেরকে সেই সম্মান দেওয়া। তারা আল্লাহর বান্দা বা দাস। আল্লাহ্ তাদেরকে সম্মানিত করেছেন, তাদের মর্যাদাকে উঁচু করেছেন এবং তাদেরকে নৈকট্য দান করেছেন। তাদের কেহ্ কেহ্ আল্লাহর ওয়াহী ইত্যাদির রাসূল বা দূত। আল্লাহ্ তাদেরকে যতটুকু ক্ষমতার মালিক করেছেন,তারা ততটুকু ক্ষমতারই মালিক। তার পরও তারা তাদের নিজেদের ও অন্যদের লাভ-ক্ষতির মালিক নয়। এই জন্য আল্লাহ্ ছাড়া তাদেরকে এ রুবুবীয়াতের বা প্রভুত্তের গুনে গুনাম্বিত করা তো দূরের কথা, যেমন-নাসারারা রূহুল কুদ্দুস (জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম) সম্পর্কে ধারণা করেছে বরং তাদের জন্যে ইবাদাতের কোন অংশ পালন করা বৈধ নয়। আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَداً سُبْحَانَهُ بَلْ عِبَادٌ مُّكْرَمُونَ – لَا يَسْبِقُونَهُ بِالْقَوْلِ وَهُم بِأَمْرِهِ يَعْمَلُونَ

[سورة الأنبياء، الآيتان: 26-27]

অর্থঃ ((তারা বললঃ দয়াময় আল্লাহ্ সন্তান গ্রহণ করেছে। তাঁর জন্য কখনও ইহা যোগ্য নয়। বরং তাঁরা (ফিরিশতারা) তো তাঁর সম্মানিত বান্দা। তারা আগে বেড়ে কথা বলতে পারেনা এবং তারা তাঁর আদেশেই কাজ করে।)) [সূরা আল-আম্বিয়া,আয়াত-২৬-২৭] তিনি আরো বলেনঃ

لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

[سورة التحريم، الآية: 6]

অর্থঃ ((তারা আল্লাহ্ তা’আলা যা আদেশ করেন,তা অমান্য করেনা এবং যা করতে আদেশ করা হয় তাই করে।)) [সূরা আত-তাহরীম,আয়াত-৬] প্রত্যেক মুসলিম নর ও নারীর উপর এতটুকু ঈমান আনা ওয়াজেব। তাদের উপর অপরিহার্য যে, ইহা জানবে ও বিশ্বাস করবে। কেননা এ বিষয়ে অজ্ঞতা কোন গ্রহণ যোগ্য ওযর বা কারণ নয়।

ফিরিশতাদের প্রতি বিস্তারিত ঈমান আনা নিম্নে বর্ণিত বিষয় গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে-

প্রথমতঃ ফিরিশতাদের সৃষ্টির মূল উত্সঃ আল্লাহ তা’আলা ফিরিশতাদের কে নূর হতে সৃষ্টি করেছেন, যেমন-জি্বন জাতিকে আগুন হতে সৃষ্টি করেছেন, এবং আদম সন্তানদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন, আর তাদের সৃষ্টি হলো আদম আলাইহিস্ সালাম এর সৃষ্টির পূর্বে। হাদীসে এসেছেঃ

خلقت الملائكة من نور، وخلق الجان من مارج من نار، وخلق آدم مما وصف لكم

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((ফিরিশতারা নূর হতে, জিনেরা অগি্ন স্ফুলিঙ্গ হতে, আর আদম আলাইহিস্ সালাম মাটি হতে সৃষ্ট।)) [মুসলিম শরীফ]

দ্বিতীয়তঃ ফিরিশতাদের সংখ্যাঃ ফিরিশতারা সৃষ্ট জীব, তাদের আধিক্যের জন্যে আল্লাহ্ আয্যা ও জাল্লা ছাড়া তাদের সংখ্যা কেহ জানেনা। আকাশে প্রতি চার আংগুল পরিমাণ জায়গায় একেক জন ফিরিশতা সিজ্দারত অথবা দন্ডায়মান অবস্থায় রয়েছেন। সপ্তম আকাশে আল- বায়তুল মা’মুরে সত্তর হাজার ফিরিশতা প্রত্যহ প্রবেশ করছেন। তাদের আধিক্যতার জন্যে দ্বিতীয় বার ফিরে আসার সুযোগ পাবেননা। কিয়ামত দিবসে জাহান্মাম উপস্থিত করা হবে, তার সত্তর হাজার লাগাম হবে। প্রত্যেক লাগামে সত্তর হাজার ফিরিশতা হবে, তারা জাহান্মকে টেনে নিয়ে আসবে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ

[سورة المدثر، الآية: 31]

অর্থঃ ((আর আপনার পালন কর্তার বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন।)) [সূরা আল-মুদ্দাছির,আয়াত-৩১] হাদীসে এসেছে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

أطَّت السماء وحق أن تئطَّ، ما فيها موضع قدم إلا وفيه ملك ساجد وراكع

অর্থঃ ((আকাশ গর্জন করছে,আর গর্জন করারই কথা। কারণ প্রত্যেক জায়গায় সিজ্দা কারী ও রুকুকারী ফিরিশতা রয়েছে।)) তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল-বাইতুল মা’মুর সম্পর্কে বলেনঃ

يدخله في كل يوم سبعون ألف ملك لا يعودون إليه

[رواه البخاري ومسلم]

অর্থঃ ((বাইতুল মা‘মুরে প্রত্যহ সত্তর হাজার ফিরিশতা প্রবেশ করেন, তারা দ্বিতীয় বার ফিরে আসার সুযোগ পাবেননা।)) [বুখারী ও মুসলিম ] তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ

يؤتي بجهنم يومئذٍ لها سبعون ألف زمام، مع كل زمام سبعون ألف ملك

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((জাহান্মাম কে নিয়ে আসা হবে, সে দিন তার সত্তর হাজার লাগাম হবে। আর প্রত্যেক লাগামে সত্তর হাজার ফিরিশতা হবে।)) [মুসলিম] এখানে ফিরিশতাদের এক বিরাট সংখ্যা প্রকাশিত হল। যারা প্রায় (৭০০০০ ৭০০০০=) ৪৯০কোটি জন ফিরিশতা তবে বাকী ফিরিশতাদের সংখ্যা কত হতে পারে? পবিত্রতা সেই সত্তার যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তাদেরকে পরিচালনা করেন। তাদের সংখ্যা পরিসংখ্যান করে রেখেছেন।

তৃতীয়তঃ ফিরিশতাদের নামঃ কুরআন ও হাদীসে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্যে যে, সকল ফিরিশতাদের নাম উল্লেখ্য করেছেন, তাদের প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন তিনজন।

() জিবরীলঃ তাকে জিবরাঈল ও বলা হয়। তিনিই রুহুল কুদ্দস, যিনি ওয়াহী-যা অন্ত-রের সুধা-নিয়ে রাসূলগণের নিকট অবতরণ হন।

() মিকাঈলঃ তাকে প্রশান্তি বলা হয়। বৃষ্টি বর্ষণের দায়িত্বে নিয়োযিত, যা জমির জীবিকা স্বরূপ। আল্লাহ যেখানে বর্ষণের আদেশ দেন সেখানে বর্ষণ পরিচালনা করেন।

() ইসরাফীলঃ তিনি শিংগায় ফুতকার দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছেন। পার্থিব্য জীবন শেষে পারলৌকিক জীবন শুরু হওয়ার ঘোষনা স্বরূপ এবং এর দ্বারাই, (মৃত) দেহ সমূহের পুনরুজীবন ঘটবে।

চতুর্থতঃ ফিরিশতাদের সিফাত বা বৈশিষ্ট্যঃ ফিরিশতারা প্রকৃত সৃষ্টি জীব। তাদের প্রকৃত শরীর রয়েছে যা সৃষ্টিগত ও চরিত্র গত গুনে গুনাম্বিত, নিম্নে তাদের কিছু গুন বর্ণনা করা হলোঃ

() তাদের সৃষ্টি মহান এবং তাদের শরীর হলো বিশাল আকৃতিরঃ আল্লাহ তা‘য়ালা ফিরিশতাদেরকে শক্তি শালী ও বড় আকৃতীতে সৃষ্টি করেছেন। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে আসমান ও যমিনে যে বড় বড় কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন, তারা তার উপযোগী।

() তাদের ডানা রয়েছেঃ আল্লাহ তা‘আলা ফিরিশতাদের জন্যে দুই, তিন ও চার বা ততোধিক পাখা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। যেমন- রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীল ‘আলাইহিস্ সালাম কে দেখেছিলেন, তার নিজ আকৃতি ছয়শত পাখা বিশিষ্ট অবস্থায়। যা আকাশের প্রান্তভাগ ঢেকে রেখেছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

الْحَمْدُ لِلَّهِ فَاطِرِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ جَاعِلِ الْمَلَائِكَةِ رُسُلاً أُولِي أَجْنِحَةٍ مَّثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ يَزِيدُ فِي الْخَلْقِ مَا يَشَاءُ

[سورة فاطر، الآية: 1]

অর্থঃ ((সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা এবং ফিরিশতাদেরকে করেছেন বার্তাবাহক- তারা দুই দুই, তিন তিন ও চার চার পাখা বিশিষ্ট। তিনি সৃষ্টির মধ্যে যা ইচ্ছা বৃদ্ধি করেন।)) [সূরা ফাত্বির,আয়াত-১]

() তাদের পানাহার প্রয়োজন হয় নাঃ আল্লাহ তা‘আলা ফিরিশতাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা পানাহারের মুহতাজ বা মুখাপেক্ষী নন। তারা বিবাহ করেননা, সন্তান ও হয়না।

() ফিরিশতারা অন্তর বিশিষ্ট জ্ঞানীঃ তাঁরা আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন, এবং আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলেছেন। তারা আদম ও অন্যান্য নবীদের সাথে ও কথা বলেছেন।

() তাদের নিজ আকৃতি ছাড়া অন্য আকৃতি ধারণ করার ক্ষমতা রয়েছেঃ আল্লাহ স্বীয় ফিরিশতাদেরকে পুরুষ মানুষের আকৃতি ধারণ করার ক্ষমতা দিয়েছেন। ইহা মূর্তি পূজকদের ভ্রান্ত ধারণার খন্ডন। যারা ধারণা করে যে ফিরিশতারা আল্লাহর মেয়ে বা কন্যা। তাদের আকৃতি ধারনের পদ্ধতি আমাদের জানা নেই। তবে তারা এমন সূক্ষ্ম আকৃতি ধারণ করে যে তাদের ও মানুষের মাঝে পার্থক্য করা কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়ে।

() ফিরিশতাদের মৃত্যুবরণঃ মালাকুল মাউত বা জান কবজকারী ফিরিশতা সহ সকল ফিরিশতারা কিয়ামত দিবসে মৃত্যু বরণ করবেন। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে যে যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সে দায়িত্ব পালন করার জন্য পুনরুথ্যান করা হবে।

() ফিরিশতাদের ইবাদাতঃ ফিরিশতারা আল্লাহর অনেক ধরণের ইবাদাত করেন। সালাত, দো’আ, তাসবীহ রুকু, সিজদাহ, ভয়-ভীতি ও ভাল বাসা ইত্যাদি।

তাদের ইবাদাতের বর্ণনা নিম্নরূপঃ

(১) তারা ক্লান্তহীন ভাবে আল্লাহর ইবাদাতে সর্বদায় রত থাকেন।

(২) তারা একনিষ্টতার সাথে আল্লাহ তা‘আলার জন্যে ইবাদাত করেন।

(৩) তারা নাফারমানী বর্জন করে সর্বদায় আনুগত্যে মাশগুল থাকেন, কেননা তারা মা‘সুম অর্থাৎ, নাফারমানী ও পাপাচার হতে মুক্ত।

(৪) অধিক ইবাদাত করার সাথে সাথে আল্লাহর জন্য বিনয়-নম্রতা প্রকাশ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

يُسَبِّحُونَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُونَ

[سورة الأنباء، الآية: 20]

অর্থঃ ((তারা রাত্রি দিন তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে এবং ক্লান্ত হয়না।)) [সূরা আল-আম্বিয়া,আয়াত-২০]

পঞ্চমতঃ ফিরিশতাদের কর্ম সমূহঃ ফিরিশতারা অনেক বড় বড় কাজ সম্পাদন করেন, যার দায়িত্ব আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন। সে কাজ গুলো নিম্নরূপঃ

(১) আরশ বহন করা।

(২) রাসূলগণের উপর ওয়াহী অবতীর্ণের দায়িত্ব প্রাপ্ত ফিরিশতা।

(৩) জান্নাত ও জাহান্নামের পাহারাদার।

(৪) উদ্ভিদ, বৃষ্টি বর্ষণ ও বাদল পরিচালনার দায়িত্ব প্রাপ্ত।

(৫) পাহাড়-পর্বতের দায়িত্ব প্রাপ্ত।

(৬) শিংগায় ফুৎকারের দায়িত্ব প্রাপ্ত ফিরিশতা।

(৭) আদম সন্তানের কর্ম লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব প্রাপ্ত।

(৮) আদম সন্তানকে হেফাযত করার দায়িত্ব প্রাপ্ত। আল্লাহ যখন আদম সন্তানের উপর কোন কাজ নির্ধারণ করেন, তখন তারা তাকে পরিত্যাগ করেন, অতঃপর আল্লাহ তাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছিলেন, তা পতিত হয় বা সংঘটিত হয়।

(৯) মানুষের সাথে থাকার ও তাদেরকে কল্যানের দিকে আহ্বানের দায়িত্ব প্রাপ্ত।

(১০) জরায়ুতে বীর্য সঞ্চার, মানুষের (দেহে) অন্তরে আত্মা প্রক্ষেপ, তার রিযিক, কর্ম ও সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য লিপিবদ্ধে দায়িত্ব প্রাপ্ত ফিরিশতা।

(১১) মৃত্যুর সময় আদম সন্তানের আত্মা কবজ করার দায়িত্ব প্রাপ্ত ফিরিশতা।

(১২) মানুষকে কবরে জিজ্ঞাসাবাদ এবং উত্তর অনুযায়ী শান্তি বা শাস্তি প্রদানে দায়িত্ব প্রাপ্ত।

(১৩) নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর তাঁর উম্মতের সালাম পৌঁছানোর দায়িত্ব প্রাপ্ত ঐ। তাই মুসলিম ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর তার সালাম প্রেরণের জন্য তাঁর কাছে (তাঁর কবরের কাছে) ভ্রমণের প্রয়োজন হয় না। বরং পৃথিবীর যে কোন স্থান হতে তাঁর উপর সালাম, ও দরুদ পাঠ করাই যথেষ্ট। কারণ ফিরিশতারা তার সালাম পৌঁছিয়ে দেন। মাসজিদে নাবাবীতে এক মাত্র নামাজ পড়ার উদ্দেশে ভ্রমণ করা বৈধ রয়েছে।

উল্লেখিত এ প্রসিদ্ধ কাজ সমূহ ব্যতীত তাদের (ফিরিশতাদের) আরো অনেক কাজ রয়েছে। নিম্নে এর প্রমাণ বর্ণিত হলো-

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا

[سورة غافر، الآية: 7]]

অর্থঃ ((যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার চার পাশে আছে, তারা তাদের পালনকর্তার সপ্রশংসা পবিত্রতা বর্ণনা করে, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।)) [সূরা গাফির, আয়াত-৭] তিনি আরো বলেনঃ

قُلْ مَن كَانَ عَدُوّاً لِّجِبْرِيلَ فَإِنَّهُ نَزَّلَهُ عَلَى قَلْبِكَ بِإِذْنِ اللّهِ

[سورة البقرة، الآية: 97]

অর্থঃ ((আপনি বলে দিন, যে কেউ জিবরাঈলের শক্র হয়-যেহেতু তিনি আল্লাহর আদেশে এ কালাম আপনার অন্তরে নাযিল করেছেন।)) [সূরা আল-বাক্বারা,আয়াত-৯৭] তিনি আরো বলেনঃ

وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ فِي غَمَرَاتِ الْمَوْتِ وَالْمَلآئِكَةُ بَاسِطُواْ أَيْدِيهِمْ أَخْرِجُواْ أَنفُسَكُمُ

[سورة الأنعام، الآية: 93]

অর্থঃ ((যদি আপনি দেখেন যখন জালেমরা মৃত্যু-যন্ত্রনায় থাকে এবং ফিরিশতারা স্বীয় হস্ত প্রসারিত করে বলে, বের কর স্বীয় আত্মা।)) [সূরা আল-আনআম,আয়াত-৯৩]

ষষ্টতঃ আদম সন্তানের উপর ফিরিশতাদের অধিকারঃ

(ক) তাদের প্রতি ঈমান আনা।

(খ) তাদেরকে ভাল বাসা, সম্মান করা,ও তাদের মর্যাদা বর্ণনা করা।

(গ) তাদেরকে গালি দেওয়া, মর্যাদা ক্ষুন্য করা,ও তাদেরকে নিয়ে হাসি রহস্য করা হারাম।

(ঘ) ফিরিশতারা যা অপছন্দ করেন তা হতে দূরে থাকা। কারণ,আদম সন্তানরা যাতে কষ্ট পায়,তারাও তাতে কষ্ট পায়।

ফিরিশতাদের প্রতি ঈমান আনার সুভফলাফলঃ

(ক) ঈমান পরিপূর্ণ হয়। কারণ তাদের প্রতি ঈমান আনা ছাড়া কারো ঈমান পরিপূর্ণ হবেনা।

(খ) তাদের সৃষ্টিকর্তার মহত্ব বা শ্রেষ্ঠত্ব ও তাঁর শক্তি ও রাজত্বে জ্ঞান অর্জন। কারণ, সৃষ্টিকর্তার, শ্রেষ্ঠত্ব হতে সৃষ্টি জীবের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়।

(গ) তাদের গুণাগুণ, তাদের অবস্থা, ও কর্ম জানার মাধ্যমে মুসলিম ব্যক্তির ঈমান বৃদ্ধি পায়।

(ঘ) আল্লাহ তা‘আলা যখন মুমিনদেরকে ফিরিশতা দিয়ে হেফাযত করেন, তখন তাদের (মুমিনদের) শান্তি ও তৃপ্তি অর্জন হয়।

(ঙ) তাদের ইবাদাত সঠিক পন্থায় হওয়ায় ও মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার কারণে ফিরিশতাদেরকে ভালবাসা।

(চ) খারাপ ও নাফারমানী পূর্ণ কাজকে অপছন্দ করা।

(ছ) আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের গুরুত্ব দেন এই জন্য তাঁর প্রশংসা করা। যেমন আল্লাহ ঐ সকল ফিরিশতাদের কাউকে তাদেরকে (বান্দাদেরকে) হিফাজতের,ও কর্ম লিখার ইত্যাদি কল্যাণ জনক কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন।

তৃতীয়স্তম্ভ

الركن الثالث :الإيمان بالكتب

তৃতীয় রুকনঃ আসমানী গ্রন্থ সমূহের প্রতি ঈমান

রাসূলগণের উপর আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান আনা, ইহা ঈমানের তৃতীয় রুকন বা স্তম্ভ। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলগণ কে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছেন। এবং তাঁদের (রাসূলগণের) উপর কিতাব সমূহ অবতীর্ণ করেছেন, মাখলুকাতের হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ। যাতে-দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যশীল হয়। এবং যাতে তাদের চলার একটি সুন্দর পথ হয়। আর মানুষ যে বিষয়ে মতনৈক্যে লিপ্ত, তার সমাধানকারী বা ফায়সালাকারী হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

َقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ

[سورة الحديد، الآية:25]

অর্থঃ ((আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও মীযান (মানদন্ড) যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্টা করে।)) [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত-২৫] তিনি আরো বলেনঃ

كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُواْ فِيهِ

[سورة البقرة، الآية:213]

অর্থঃ ((সকল মানুষ একই জাতি সত্তার অর্ন্তভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নবীদেরকে পাঠালেন সুসংবাদ দাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে। আর তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করলেন সত্য কিতাব, যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন।)) [সূরা আল-বাক্বারা,আয়াত-২১৩]

() কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান আনার মূল কথাঃ

কিতাব সমূহের প্রতি ঈমানঃ এ কথার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহর অনেক কিতাব রয়েছে। যা তিনি তাঁর রাসূলগণের (আলাইহিমুস সালাম) উপর নাযিল করেছেন। আর তা সত্যিকার অর্থে তাঁর (আল্লাহর) বাণী। আর তা হল জ্যোতি ও হিদায়াত। আর নিশ্চয় এ কিতাব সমূহের মধ্যে যা রয়েছে তা সত্য ও ন্যায় সিণ্ঠ, এর অনুসরণ করা ও তদানুযায়ী আমল করা ওয়াজিব। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া এ কিতাব সমূহের সংখ্যা কেউ জানে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

وَكَلَّمَ اللّهُ مُوسَى تَكْلِيماً

[سورة النساء، الآية:164]

অর্থঃ ((আর আল্লাহ মূসার সাথে কথোপথন করেছেন সরাসরি।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত-১৬৪] তিনি আরো বলেনঃ

وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلاَمَ اللّهِ

[سورة التوبة، الآية:6]

অর্থঃ ((আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দিবে, যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়।)) [সূরা আত তাওবাহ-আয়াত-৬]

() কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান আনার বিধানঃ

সকল কিতাবের প্রতি ঈমান আনা যা আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের (আলাইহিমুস সালাম) উপর অবতীর্ণ করেছেন, আল্লাহ তা‘বারাকা ও তা‘আলা সত্যিকার অর্থে কিতাব সমূহের মাধ্যমে কথা বলেছেন। এবং তা (আল্লাহর পক্ষহতে) অবতীর্ণ, মাখলুক বা সৃষ্ট নয়,আর যে ব্যক্তি তা (কিতাব সমূহ) অথবা তাঁর কিছুকে অঙ্গীকার করবে, সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ آمِنُواْ بِاللّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِيَ أَنزَلَ مِن قَبْلُ وَمَن يَكْفُرْ بِاللّهِ وَمَلاَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلاَلاً بَعِيداً

[سورة النساء، الآية:136]

অর্থঃ ((হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন কর এবং বিশ্বাস স্থাপন কর তাঁর রাসূল ও তাঁর কিতাবের উপর ,যা তিনি অবতীর্ণ করেছেন স্বীয় রাসূলের উপর এবং সে সমস্ত কিতাবের উপর যে গুলো অবতীর্ণ করা হয়েছিল ইতিপূর্বে। যে আল্লাহর উপর,তাঁর ফিরিশতাদের উপর, তাঁর কিতাব সমূহের উপর,এবং রাসূলগণের উপর ও কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস করবেনা, সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহু দূরে গিয়ে পড়বে।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত-১৩৬] তিনি আরো বলেনঃ

وَهَـذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُواْ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

[سورة الأنعام، الآية:155]

অর্থঃ ((এটি এমন একটি গ্রন্থ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি, খুব মঙ্গলময়। অতএব এর অনুসরণ কর এবং ভয়কর-যাতে তোমরা করুনা প্রাপ্ত হও।)) [সূরা আল-আনআম,আয়াত-১৫৫]

() এসব কিতাবের প্রতি মানুষের প্রয়োজনীয়তা এবং তা অবতীর্ণ করার পিছনে হিকমাত বা রহস্যঃ

প্রথমতঃ যাতে রাসূল ‘আলাইহিস্ সালামের উপর অবতীর্ণ কিতাব তাঁর উম্মাতের জন্য জ্ঞান কোষ স্বরূপ হয়। ফলে তারা তাদের দ্বীন সম্পর্কে জানার জন্যে এর দিকে প্রত্যাবর্তন করে।

দ্বিতীয়তঃ যাতে রাসূল ‘আলাইহিস্ সালামের উপর অবতীর্ণ কিতাব তাঁর উম্মাতের প্রত্যেক মতনৈক্য পূর্ণ বিষয়ে ইনসাফ ভিক্তিক বিচারক হয়।

তৃতীয়তঃ যাতে অবতীর্ণ কিতাব রাসূল ‘আলাইহিস্ সালামের ইন্তেকালের পর দ্বীন বা ধর্ম সংরক্ষণকারী হিসাবে দাঁড়াতে পারে, স্থান ও কালের যতই দুরুত্ব হোকনা কেন। যেমন-আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর (পরবর্তী)দাওয়াতের অবস্থা।

চতুর্থতঃ যাতে এ অবতীর্ণ কিতাব সমূহ আল্লাহর পক্ষহতে হুজ্জাত (পক্ষ বিপক্ষের দলীল)স্বরূপ হয়। যেন সৃষ্টি জীব এর (কিতাব সমূহের) বিরোধিতা করা এবং এর আনুগত্য হতে বের হয়ে যাওয়ার সমর্থ্য না রাখে। আল্লাহ্ তা‌‌’আলা বলেনঃ

كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُواْ فِيهِ

[سورة البقرة، الآية:213]

অর্থঃ ((সকল মানুষ একই জাতি সত্ত্বার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নবীদেরকে পাঠালেন সুসংবাদ দাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসাবে। আর তাদের সাথে অবতীর্ণ করলেন সত্য কিতাব,যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন।)) [সূরা আল-বাক্বারা,আয়াত-২১৩]

() কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান আনার নিয়মঃ

আল্লাহর কিতাব সমূহের প্রতি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত ভাবে ঈমান আনা হয়ে থাকে।

সংক্ষিপ্ত ঈমানঃ এ বিশ্বাস করবে (ঈমান আনা) যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলগণের উপর অনেক কিতাব অবতীর্ণ করেছেন।

বিস্তারিত ভাবে ঈমানঃ ইহা হলো, আল্লাহ কুরআন কারীমে যে সকল কিতাবের নাম উল্লেখ্য করেছেন, তার প্রতি ঈমান আনা। তা হতে আমরা জেনেছি-কুরআন, তাওরাত, যাবুর, ইনজীল, এবং ইব্রাহীম, ও মূসা এর প্রতি অবতীর্ণ পুস্তিকা সমূহ (আলাইহিমুস সালাম)।

আরো ঈমান আনা যে, ঐসকল কিতাব ছাড়াও আল্লাহর অনেক কিতাব রয়েছে, যা তাঁর নবীগণের উপর অবতীর্ণ করেছেন। আর আল্লাহ ছাড়া ঐ সকল কিতাবের নাম ও সংখ্যা কেউ জানেনা। এ কিতাব গুলো অবতীর্ণ হয়েছে যাবতীয় সতকর্ম ও ইবাদাত একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার নিমিত্তে সম্পাদনের মাধ্যমে তাঁর তাওহীদ (একত্ববাদ) বাস্তবায়ন এবং পৃথিবীতে শিরক ও অন্যায়-অনাচার দূরীভূত করার জন্য। মূলত সকল নবীদের দাওয়াত এক মূলনীতির (তাওহীদ প্রতিণ্ঠা ও শির্ক বর্জনের) উপর ছিল, যদিও তাঁরা নিয়ম কানুন ও বিধি-বিধানে কিছুটা ভিন্ন রকম ছিলেন।

এ ঈমানও রাখা যে, পূর্ববর্তী রাসূলদের প্রতি (আল্লাহর পক্ষ হতে) কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল । আর আল-কুরআনের প্রতি ঈমান আনা হলোঃ তা (অন্তরে ও মুখে) স্বীকৃতি দেয়া এবং কুরআনে যা রয়েছে তা অনুসরণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللّهِ وَمَلآئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ

[سورة البقرة، الآية:285]

অর্থঃ ((রাসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালন কর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুমিনরাও। সকলেই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থ সমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি।)) [সূরা আল-বাক্বারা,আয়াত-২৮৫] তিনি আরো বলেনঃ

اتَّبِعُواْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلاَ تَتَّبِعُواْ مِن دُونِهِ أَوْلِيَاء

[سورة الأعراف، الآية:3]

অর্থঃ তোমরা অনুসরণ কর,যা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য সাথীদের অনুসরণ করোনা। [সূরা আল-আ‘রাফ,আয়াত-৩]

পূর্ববতী কিতাবের চেয়ে কুরআনের কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট রয়েছেঃ

(১) আল-কুরআন স্বীয় শব্দ, অর্থ এবং তাতে যে জ্ঞান ও পার্থিব তথ্য রয়েছে তা সর্ব বিষয়ে এক অলৌকিক শক্তি।

(২) আল-কুরআন সর্ব শেষ আসমানী কিতাব, কুরআনের মাধ্যমে আসমানী কিতাবের সমাপ্তি ঘটেছে। যেমন-আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রিসালাতের দ্বারা সকল রিসালাতের পরিসমাপ্তি ঘটেছে।

(৩) সকল প্রকার বিকৃতি ও পরিবর্তন হতে আল্লাহ কুরআনকে হেফাজত করবেন। ইহা অন্যান্য কিতাব হতে সতন্ত্র। কেননা সে সব কিতাবে বিকৃতি ও পরিবর্তন পরিবর্ধন ঘটেছে।

(৪) আল-কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়ন ও সংরক্ষণকারী।

(৫) কুরআন পূর্ববর্তী সকল কিতাবের রহিতকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

مَا كَانَ حَدِيثاً يُفْتَرَى وَلَـكِن تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ

[سورة يوسف، الآية:111]

অর্থঃ ((এটা কোন মনগড়া কথা নয়, কিন্ত যারা বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের জন্য পূর্বেকার কালামের সামর্থন এবং প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ রহমত ও হিদায়াত।)) [সূরা ইফসুফ,আয়াত-১১১]

() পূর্ববর্তী কিতাব সমূহের সংবাদ গ্রহণ করাঃ

আমরা নিশ্চিত ভাবে জানি যে, পূর্ববর্তী কিতাবে আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের নিকটে ওয়াহীর মাধ্যমে যে সংবাদ দিয়েছেন তা সত্য, তাতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই। এর অর্থ এ নয় যে, বর্তমানে আহলে কিতাবদের (ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের) নিকট যে কিতাব রয়েছে তা গ্রহণ করবো। কারণ তা বিকৃত করা হয়েছে, আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের নিকট যে ভাবে অবতীর্ণ করেছেন সে ভাবে নেই। পূর্ববর্তী কিতাব হতে আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর কিতাবে (কুরআনে) যে সংবাদ দিয়েছেন তা হতে আমরা নিশ্চিত ভাবে জেনেছি যে, কেউ কারও গোনাহ বহন করবে না। মানুষ তাই পায় যা সে করে, তার কর্ম শীঘ্রই দেখানো হবে, অতঃপর তাকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

َمْ لَمْ يُنَبَّأْ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَى – وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفَّى – أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى – وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى – َأَنَّ سَعْيَهُ سَوْفَ يُرَى – ثُمَّ يُجْزَاهُ الْجَزَاء الْأَوْفَى

[سورة النجم، الآيات:36-41]

অর্থঃ ((তাকে কি জানানো হয়নি যা আছে মূসার কিতাবে এবং ইবরাহীমের কিতাবে যে,তার দায়িত্ব পালন করে ছিল ? কিতাবে আছে যে, কেউ কারও গোনাহ বহন করবে না, এবং মানুষ তাই পায় যা সে করে। আর তার কর্ম শীঘ্রই দেখানো হবে, অতঃপর তাকে পূর্ণ-প্রতিদান দেয়া হবে।)) [সূরা আন-নজম,আয়াত-৩৬-৪১] তিনি আরো বলেনঃ

َلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا – وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى – إِنَّ هَذَا لَفِي الصُّحُفِ الْأُولَى – صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى

[سورة الأعلى، الآيات:16-19]

অর্থঃ ((বস্ততঃ তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও,অথচ পরকালের জীবন উতকৃষ্ট ও স্থায়ী। এটা লিখিত রয়েছে পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে, ইবরাহীম ও মূসার কিতাব সমূহে।)) [সূরা আল-আ‘লা,আয়াত-১৬-১৯]

পূর্ববর্তী কিতাবের বিধানঃ কুরআনে যে সকল বিধান রয়েছে তা মেনে চলা আমাদের অপরিহার্য। তবে পূর্ববর্তী কিতাবে যা রয়েছে তা নয়। কারণ আমরা দেখবো পূর্ববর্তী কিতাবে যে বিধান রয়েছে তা যদি আমাদের শরিয়াতের পরিপন্থী হয়, তবে আমরা তা আমল করবো না, তা বাতিল এ জন্যে নয়, বরং তা সে সময় সত্য ছিল, এখন তা আমল করা আমাদের উপর অপরিহার্য নয়। কারণ তা আমাদের শরীয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। আর যদি তা আমাদের শরীয়াতের অনুসরণ হয়, তবে তা সত্য বলে বিবেচিত হবে। আমাদের শরীয়াত তা সত্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।

() কুরআন হাদীসে যে সকল আসমানী কিতাবের নাম উল্লেখ্য হয়েছে তা হলোঃ

() কুরআনুল কারীমঃ কুরআন হল আল্লাহর বানী যা তিনি শেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নাযিল করেছেন। কুরআন সর্বশেষ অবতীর্ণ কিতাব। আল্লাহ কুরআনকে বিকৃতি ও পরির্বতন হতে হেফাযত করার দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেছেন এবং সকল আসমানী কিতাবের রহিতকারী করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ

[سورة الحجر، الآية:9]

অর্থঃ ((আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতরণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।)) [সূরা আল-হিজর, আয়াত-৯] তিনি আরো বলেনঃ

وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقاً لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِناً عَلَيْهِ فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللّهُ

[سورة المائدة، الآية:48]

অর্থঃ ((আমি আপনার প্রতি অবতীর্ন করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববর্তী গ্রন্থ সমূহের সত্যায়নকারী এবং সে গুলোর বিষয়বস্তর রক্ষণা বেক্ষণকারী। অতএব আপনি তাদের পারস্পারিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুযায়ী ফয়সালা করুন।)) [সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত-৪৮]

() তাওরাতঃ তাওরাত ঐ কিতাব যাকে আল্লাহ মূসা ‘আলাইহিস্ সালামের উপর নূর (জ্যোতি) ও হিদায়াত স্বরূপ নাযিল করেছিলেন। বানী ইসরাঈলের নবী ও আলেমগণ এর দ্বারা ফায়সালা করতেন। সুতরাং মূসা ‘আলাইহিস্ সালামের উপর আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব তাওরাত এর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব, বর্তমান তথা কথিত ইয়াহুদীদের হাতে বিকৃত তাওরাতের প্রতি নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

ِنَّا أَنزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُواْ لِلَّذِينَ هَادُواْ وَالرَّبَّانِيُّونَ وَالأَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُواْ مِن كِتَابِ اللّهِ

[سورة المائدة، الآية:44]

অর্থঃ ((আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছি, এতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে, আল্লাহর আনুগত্যশীল নবী, আল্লাহভক্ত ও আলেমরা এর মাধ্যমে ইয়াহুদীদের ফায়সালা দিতেন। কেননা তাদেরকে আল্লাহর এই গ্রন্থের দেখা শোনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।)) [সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত-৪৪]

() ইঞ্জীলঃ ইঞ্জীল ঐ কিতাব যা সত্যিকার অর্থে আল্লাহ ঈসা ‘আলাইহিস্ সালামের উপর নাযিল করেছিলেন, যা পুর্ববর্তী সকল আসমানী কিতাবের সত্যায়নকারী। সুতরাং ঐ ইঞ্জীলের উপর ঈমান আনা ওয়াজিব, যা সঠিক মূলনীতি সহ আল্লাহ ঈসা ‘আলাইহিস্ সালামের উপর নাযিল করেছিলেন। খৃষ্টানদের নিকট বিক্রিত ইঞ্জীল সমূহে নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

وَقَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِم بِعَيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقاً لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَآتَيْنَاهُ الإِنجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ وَمُصَدِّقاً لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةً لِّلْمُتَّقِينَ

[سورة المائدة، الآية:46]

অর্থঃ ((আমি তাদের পেছনে মারিয়ামের পুত্র ঈসাকে প্রেরণ করেছি। তিনি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তাওরাতের সত্যায়নকারী ছিলেন। আমি তাকে ইঞ্জীল প্রদান করেছি। এতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে। এটি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তাওরাতের-সত্যায়ন করে,পথ প্রদর্শন করে এবং এটি আল্লাহভীরুদের জন্যে হেদায়াত ও উপদেশবানী।)) [সূরা আল-মায়িদাহ,আয়াত-৪৬] তাওরাত ও ইঞ্জীলে যা রয়েছে তন্মধ্যে আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর রিসালাতের সুসংবাদ রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوباً عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَآئِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالأَغْلاَلَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ

[سورة الأعراف، الآية:157]

অর্থঃ ((যারা আনুগত্য করে এ রাসূলের, যিনি নিরক্ষর নবী,যার সম্পর্কে তাদের নিজেদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিখা দেখতে পায়, তিনি তাদেরকে নির্দেশদেন সতকর্মের, বারণ করেন অসতকর্ম থেকে, তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষনা করেন ও নিষিদ্ধ করেন নিকৃষ্ট বুæসমূহ, আর তাদের উপর থেকে সে বোঝা নামিয়েছেন এবং বন্দীত্ব অপসারণ করেন যা তাদের উপর বিদ্যমান ছিল।)) [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত-১৫৭]

() যাবুরঃ যাবুর ঐ কিতাব যা আল্লাহ দাউদ ‘আলাইহিস্ সালামের উপর নাযিল করেছিলেন। সুতরাং ঐ যাবুরের প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব যা আল্লাহ দাউদ ‘আলাইহিস্ সালামের উপর নাযিল করেছিলেন। সে যাবুর নয় যা ইয়াহুদীরা বিকৃত করে ফেলেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُوراً

[سورة النساء، الآية:163]

অর্থঃ ((আর দাউদকে দান করেছি যাবুর।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত-১৬৩]

() ইবরাহীম মূসা (আলাইহিস সালাম)এর সুহুফ বা পুস্তিকা সমূহঃ তা ঐ সকল পুস্তিকা যা আল্লাহ ইবরাহীম ও মূসা (আলাইহিস সালাম)কে দিয়েছিলেন। কুরআন ও হাদীসে যা উল্লেখ্য হয়েছে তা ছাড়া এ সকল পুস্তিকা নিরুদ্দেশ। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

َمْ لَمْ يُنَبَّأْ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَى – وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفَّى – أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى – وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى – َأَنَّ سَعْيَهُ سَوْفَ يُرَى – ثُمَّ يُجْزَاهُ الْجَزَاء الْأَوْفَى

[سورة النجم، الآيات:36-41]

অর্থঃ ((তাকে কি জানানো হয়নি যা আছে মূসার কিতাবে এবং ইবরাহীমের কিতাবে যে,তার দায়িত্ব পালন করে ছিল? কিতাবে আছে যে, কেউ কারও গোনাহ বহন করবে না, এবং মানুষ তাই পায় যা সে করে। আর তার কর্ম শীঘ্রই দেখানো হবে, অতঃপর তাকে পূর্ণ-প্রতিদান দেয়া হবে।)) [সূরা আন-নজম,আয়াত-৩৬-৪১] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেনঃ

بَلْْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا – وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى – إِنَّ هَذَا لَفِي الصُّحُفِ الْأُولَى – صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى

[سورة الأعلى، الآيات:16-19]

অর্থঃ ((বস্ততঃ তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও,অথচ পরকালের জীবন উতকৃষ্ট ও স্থায়ী। এটা লিখিত রয়েছে পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে, ইবরাহীম ও মূসার কিতাব সমূহে।)) [সূরা আল-আ‘লা, আয়াত ১৬-১৯]

লেখকঃ ডা.মু. সাইদুজ্জামান(পলাশ)

ডা.মু. সাইদুজ্জামান(পলাশ)

Regional Sales Manager,Century Agro Ltd;Ex-Area Executive,ACI Godrej,Ex-Farm Executive,Kazi Farms Group;Ex-Manager(Technical);Prime Care&Krishi Pannya Feed;Ex-Livestock Officer,RDRS Bangladesh(CLP),Ex-Trainer,UDDIPON;DVM from BAU ,
Present address:Santinagar,Joypurhat.
Permanent address: Islambag (chini masjid); saidpur; nilphamari,
E-mail: tasaidvm81@gmail.com,
Cell phone-01755635268&01190909775

এটাও দেখতে পারেন

এসএসসি পরীক্ষা ২০১৫ এর ফলাফল দেখুন

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেখতে আমাদের বেশ বেগ পেতে হয়। অতিরিক্ত চাপ থাকায় ওয়েব পেজ খুলতে অনেক সময় লাগে। এদিকে প্রিয়জনের ফলাফল জানতে মন তখন অস্থির। তাই তুলনামূলকভাবে একটু তারাতারি যেন ফলাফলটা দেখে নিতে পারেন সেজন্য প্রথমবারের মতো ভেটসবিডিতে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল চেক করার ব্যবস্থা করলাম।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *