হাঁস-মুরগির ডিম দুটি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। একটি হলো প্রজননের উদ্দেশ্যে, এবং অপরটি হলো খাওয়ার উদ্দেশ্যে । প্রজননের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ডিমের ক্ষেত্রে কোন ধরনের অস্বাভাবিকতা গ্রহণযোগ্য হবে না। অন্য দিকে খাওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ডিমে অস্বাভাবিকতা গ্রহণযোগ্য হলেও ডিমের মার্কেট ভ্যালু ও ডিম ক্রয়ে ভোক্তার আগ্রহ কম দেখা যায়। ফলে ডিম উৎপাদনকারী খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
(ক) বাহ্যিক বা দৃশ্যমান অস্বাভাবিকতাঃ
১। ফ্যাকাসে খোসার ডিমঃ বিভিন্ন জাতের মুরগির পালকের রং অনুসারে ডিমের খোসার রং হয়ে থাকে। যেমন লাল পালকের মুরগির ডিমের রং লালচে বাদামী এবং সাদা পালকের মুরগির ডিমের রং সাধারনত সাদা হয় (তবে শুভ্রা জাতের মুরগির পালক সাদা হলেও এর ডিম লাল)। মুরগির রঙিন খোসার ডিমের স্বাভাবিক রং অনেক সময় বিভিন্ন কারনে ঠিকমত হয় না।

কারণঃ
রঙিন খোসার ডিমের স্বাভাবিক রং হারানোর জন্য বহুবিধ কারণ জড়িত। যেমন, বিভিন্ন ধরনের রোগ সংক্রমণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইনফেকসাস ব্রংকাইটিস, এগ ড্রপ সিনড্রম, খাদ্যে মাইকো টক্সিনের উপস্থিতি, বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যেমন- নাইকরবাজিন, মোনেনসিন, পাইপেরাজিন। এছাড়া অতিরিক্ত এ্যামোনিয়া গ্যাস শরীরে প্রবেশ করলে, মুরগির শরীরের তাপমাত্রা বেশি থাকলে, শরীরে পানিশূণ্যতা তৈরি হলে, ইউটেরাসে মিউকোসার প্রদাহ এবং কোন কারণে মুরগির শরীরে অত্যাধিক ধকল পড়লে রঙিন ডিমের পিগমেন্টেশনে প্রভাব পড়ে।
প্রতিকারঃ
এ সমস্যা সমাধানে এর সঙ্গে জড়িত রোগের ভ্যাক্সিন সঠিকভাবে প্রয়োগ এবং সুষ্ঠ খামার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থাৎ খামারে এ্যামোনিয়া গ্যাস উৎপাদন মাত্রা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
২। পাতলা, নরম এবং খোসাবিহীন ডিমঃ

ডিমের খোসার নির্দিষ্ট পুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু কখনো কখনো মুরগি পাতলা, নরম এবং খোসাবিহীন ডিম পাড়ে।

কারণঃ
ডিমের খোসা না থাকা এবং খোসা নরম ও পাতলা হওয়ার প্রধান কারণ সরবরাহকৃত খাদ্যে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিন ডি৩ এর অভাব, তাপজনিত ও অন্যান্য পিড়ন। তাছাড়া ইনফেকসাস ব্রংকাইটিস ও এগ ড্রপ সিনড্রম এর সংক্রমণ এবং যদি পুলেটের বয়স কম হয় ও ডিম পাড়া মুরগির দৈহিক ওজন অত্যাধিক বেশি হয় তাহলেও এ ধরনের সমস্যা হবে।
প্রতিকারঃ এ ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে মুরগিকে সুষম খাদ্য সববরাহ করতে হবে। প্রয়োজনে খাদ্যের সাথে আলাদাভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিন ডি৩ দিতে হবে। তাপ জনিত পিড়নসহ সকল পিড়ন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সময়মতো ইনফেকসাস ব্রংকাইটিস ও এগ ড্রপ সিনড্রম ভ্যাক্সিন দিতে হবে।
৩। ছোট আকৃতির ডিমঃ

মুরগির ডিমের স্বাভাবিক ওজন রয়েছে। বিভিন্ন কারনে মুরগি অনেক সময় স্বাভাবিক আকৃতির চেয়ে ছোট আকৃতির ডিম পাড়ে।
কারণঃ মুরগির দৈহিক ওজন খুব কম থাকা অবস্থায় অর্খাৎ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যদি যৌন পরিপক্কতা আসে তাহলে ডিমের ওজন ও আকার ছেঅট হয়। আবার পুষ্টিহীনতা, পরিবেশের তাপমাত্রা বেশি হলে, পানির অভাব এবং ইনফেকসাস ব্রংকাইটিস এর সংক্রমণ ঘটলে মুরগির দৈহিক ওজন স্বাভাবিক থাকা অবস্থায়ও ডিমের ওজন ছোট হতে পারে।
প্রতিকারঃ এ ক্ষেত্রে মুরগির ঘরে আলোক কর্মসূচী সমন্বয়/ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বয়স অনুযায়ী সঠিক পরিমানে সুষম খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।
৪। বড় আকৃতির বা অধিক কুসুম বিশিষ্ট ডিমঃ
এটাও ডিমের এক ধরনের অস্বাভাবিকতা। এ ধরনের ডিমের ফুড ভ্যালু বেশি হলেও মার্কেট ভ্যালু কম হয়।
কারণঃ অতিরিক্ত দৈহিক ওজনের মুরগি, বেশি বয়সের মুরগি থেকে বড় ডিম পাওয়া যায়। কোন কারনে যদি দুই বা ততোধিক Mature ova একই সময়ে ওভারিতে পৌঁছে এবং একই সময়ে অবমুক্ত হয় তাহলে মুরগি ডবল বা অধিক কুসুমযুক্ত ডিম পাড়ে।
প্রতিকারঃ মুরগির দৈহিক ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৫। বিকৃত আকৃতির ডিমঃ

মুরগির ডিমের একটি নির্দিষ্ট ও সুন্দর আকার এবং আকৃতি আছে। তবে কখনও কখনও সরু অংশ অতিশয় সরু বা চিকন দেখা যায়। আবার মোটা অংশ অধিক মোটা বা চিকন দেখা যায়।
কারনঃ অভিডাক্টে থাকার সময় অস্বাভাবিক চাপের কারণে ডিমের আকৃতির বিকৃতি ঘটে থাকে। সাধারণত মুরগি স্থানান্তর, কালিং বা অন্য কোন কারণে হ্যান্ডলিং করার সময় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
প্রতিকারঃ মুরগি স্থানান্তর, কালিং বা অন্য কোন কারণে হ্যান্ডলিং করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
৬। গোলাকার, ক্যালসিয়াম সঞ্চিত ডিমঃ
ডিমের স্বাভাবিক আকৃতি হলো একদিকে সরু এবং অপরদিকে মোটা। মুরগির ডিমের খোসার উপরিভাগ সামান্য খসখসে এবং হাঁসের ডিমের খোসার উপরিভাগ পিচ্ছিল। তবে কোন কোন সময় মুরগি গোলাকার, ক্যালসিয়াম সঞ্চিত ফুসকুড়ি যুক্ত ডিম পাড়ে।
কারণঃ ইউটেরাসে Shell secreting gland এর ইরিটেশন এবং খাদ্যে ক্যালসিয়ামের পরিমান বেশি হলে মুরগি এ ধরনের ডিম পাড়্ ।
প্রতিকারঃ যথাযথ খামার ব্যবস্থাপনা এবং সুষম খাদ্য সরবরাহ করার মাধ্যমে মুরগির এ ধরনের ডিম পাড়া প্রতিরোধ করা যায়।
(খ) ডিমের ভেতরের অস্বাভাবিকতাঃ
১। পানির মতো পাতলা অ্যালবুমিনঃ অ্যালবুমিনের নির্দিষ্ট গাঢ়ত্ব আছে । অনেক সময় ডিম ভাঙলে পানির মতো অ্যালবুমিন দেখা যায়।
কারণঃ অ্যালবুমিন পাতলা হওয়ার জন্য যে বিষয়গুলো দায়ী তা হলো তাপজনিত পিড়ন, খাদ্যে এমাইনো এসিডের ঘাটতি, খাদ্যে উচ্চমাত্রায় আফলা টক্সিনের উপস্থিতি এবং ইনফেকসাস ব্রংকাইটিস এর সংক্রমণ।
প্রতিকারঃ যথাযথ খামার ব্যবস্থাপনা, পিড়ন নিয়ন্ত্রণ, সুষম ও টক্সিনমুক্ত খাদ্য সরবরাহ এবং সঠিকভাবে ইনফেকসাস ব্রংকাইটিসের ভ্যাকসিন দেয়া।
২। অ্যালবুমিনে রক্তের ছিটাঃ যখন কুসুম ওভারি থেকে অবমুক্ত হয় তখন ছোট ছোট ব্লাড ভেসেল ভেঙে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়। তবে এ ঘটনা খুব কম ঘটে।
৩। ডিমের মধ্যে মাংসপিন্ডের উপস্থিতিঃ ওভিডাক্টের প্রাচির থেকে কিছু টিস্যু ডিমের মেধ্যে প্রবেশ করলে এ ধরনের ডিম পাড়ে। তবে এটা খুব কম ঘটে।
৪। ফ্যাকাসে কুসুম ডিমঃ মুরগির এনিমিয়া রোগ হলে এবং খাদ্যে জ্যান্থোফিল রঞ্জকের ঘাটতি হলে মুরগি এ ধরনের ডিম পাড়ে।
৫। অ্যালবুমিনের মধ্যে রিং না থাকাঃ আমরা জানি ডিমের অ্যালবুমিনের ভেতরে একটি রিং থাকে. যাকে চ্যালেজা বলে , কিন্তু মুরগি ইনফেকসাস ব্রংকাইটিস রোগে ভুগলে এই রিংটা থাকে না।
এছাড়াও ডিমের আরো অনেক অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। যেমন, কুসুম বিহীন ডিম, কুচকানো খোসার ডিম ইত্যাদি। খামারে এ ধরনের ডিম পাড়লে যে বিষয়গুলোর উপর বিশেষ নজর দেয়া দরকার তা হলো সুষম খাদ্য সরবরাহ। বিশেষকরে সরবরাহকৃত খাদ্যে প্রয়োজনীয় পরিমান ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন ডি৩, প্রোটিন, লিনোলিক এসিড ইত্যাদির উপস্থিতি থাকতে হবে।
এই প্রবন্ধটি বার্ষিক প্রাণিসম্পদ সংকলন জুন ২০১২ সংখ্যায় প্রকাশিত।
এরপরের পর্বে আমি ডিমের খোসার উপর যেসমস্ত ফ্যাক্টর জড়িত তা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরবো এবং তারপর কিভাবে খোসার গুণগতমান ধরে রাখা যায় এবং উন্নত করা যায় তাও ক্রমান্বয়ে তুলে ধরবো। ধন্যবাদ সবাইকে।
ডিমের কুসুম তিতা লাগার কারন ?