নাইট্রেট এবং নাইট্রাইট এর বিষক্রিয়াঃ কারন, প্রতিকার এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনা

উদ্ভিদে মাত্রাধিক পরিমানে নাইট্রেট সঞ্চিত হলে তা রোমন্থক প্রাণীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। খাদ্য-শস্যে নাইট্রেটের উচ্চমাত্রার ফলে প্রণীতে নাইট্রেট এবং নাইট্রাইট জনিত বিষক্রিয়া হতে পারে। নাইট্রেট অন্ত্রের প্রদাহ সৃষ্টি করে। নাইট্রেটের পরিমান অধিক হলে তা নাইট্রাইটের উৎস হিসাবে কাজ করে।  নাইট্রাইট রক্তে o2  সংযোগকে ব্যহত করে শ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘ্ন ঘটায়। রক্তে o2 ঘাটতি বেশি হলে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু ঘটে থাকে। নাইট্রেট এবং নাইট্রাইট-এর বিষক্রিয়ার প্রতি গবাদিপশুই সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। কারণ এদের রুমিনাল ফ্লোরা নাইটেটকে এমোনিয়াতে রুপান্তরিত করে এবং সেই সঙ্গে মাধ্যমিক উৎপাদন হিসাবে নাইট্রাইট উৎপন্ন করে যা নাইট্রেটের চেয়ে ১০গুন বেশি বিষাক্ত।


 ফরেজের মধ্যে নাইট্রেটের উচ্চমাত্রা

উদ্ভিদ মাটি থেকে নাইট্রেট হিসাবে নাইট্রোজেন শোষণ করে। সাধারণত নাইট্রেট রিডাকটেজ এনজাইমের সহায়তায় উদ্ভিদে নাইট্রেট এমাইনো এসিডে রুপান্তরিত হয়। এই পরিবর্তনের জন্য শক্তির প্রয়োজন হয় যা  সূর্যালোক, পর্যাপ্ত পানি, পুষ্টি উপাদান এবং অনুকুল তাপমাত্রা থেকে সংগৃহীত হয়। যখন উদ্বিদ ধকলজনিত অবস্থায় থাকে তখন নাইট্রেট থেকে এমাইনো এসিডে তথা প্রোটিনে রুপান্তর ব্যহত হয় এবং নাইট্রেট উদ্ভিদে সঞ্চিত হতে থাকে।

ফরেজের মধ্যে নাইট্রেটের উচ্চমাত্রার কারণ

১.শৈত্য প্রবাহ, মেঘলা ও শুষ্ক আবহাওয়া ইত্যাদি নানা অবস্থার কারণে প্রোটিন গঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হলে ফরেজে নাইট্রেট জমা হয় ।

২.তুষার এবং শিলাবৃষ্টিঃ তুষারপাত ও শিলাবৃষ্টিতে সধারণত গাছের পাতার উপরিভাগ প্রায় সম্পূর্ণভাবে ধবংস হয়ে যায়। ফলে,পাতার আয়তন কমে যায় এবং ফটোসিনথেসিস প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয়। এসময় গাছের শিকড় দ্বারা নাইট্রেট শোষিত হয়ে তা কান্ডে জমা হয়।

৩. অনাবৃষ্টিঃ অনাবৃষ্টির সময় মাটিতে জলীয় অংশ কম থাকে ফলে গাছ শিকড় দিয়ে নাইট্রেট শোষণ করতে পারে না। কিন্তু বৃষ্টি হওয়ার মঙ্গে সঙ্গে গাছ দ্রুত নাইট্রেট শোষন করে মজুত করে।

৪. আলোর স্বল্পতা ফটোসিনথেসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাইট্রেট এমাইনো এসিড এবং প্রোটিনে রুপান্তরিত হয়। এই কাজের জন্য শক্তির উৎস হিসাবে আলোর প্রয়োজন। যদি আলোর তীব্রতা কম থাকে তাহলে উদ্ভিদে বেশি পরিমানে নাইট্রেট সঞ্চিত হয়।

৫.তাপমাত্রাঃ  অধিকাংশ উদ্ভিদের সঠিক বৃদ্ধি ও ফটোসেনথিসিস প্রক্রিয়ার জন্য ১৩ সে এর বেশি তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। এর কম তাপমাত্রা হলে উদ্ভিদে বেশি পরিমানে নাইট্রেট শোষিত হয় এবং  কম পরিমানে এমাইনো এসিড এবং প্রোটিনে রুপান্তরিত হয়।

৬.আগাছানাশক ব্যবহারঃ আগাছানাশক যেমন ২,৪-ডি উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্থ করে। ফলে উদ্ভিদে উচ্চমাত্রায় নাইট্রেট জমা হয়।

৭.রোগ-বালাইঃ উদ্ভিদের বিভিন্ন রোগ এদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্থ করে। এর ফলে উদ্ভিদে নাইট্রেট সঞ্চিত হয়ে থাকে।

৮.উদ্ভিদের প্রজাতিঃ সব উদ্ভিদেই নাইট্রেট জমা হয় তবে আগাছা এবং খাদ্য শস্যে লেগিউম জাতীয় উদ্ভিদ ও ঘাসের চেয়ে বেশি নাইট্রেট থাকে।

৯.বৃদ্ধির ধাপঃ কচি উদ্ভিদের মধ্যে নাইট্রেটের পরিমান বেশি থাকে এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধিপ্রাপ্তির সাথে মাথে তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

১০.গাছের অংশঃ গাছের যে অংশ মাটির নিকটবর্তী থাকে সেই অংশে নাইট্রেটের পরিমান বেশি থাকে। পাতা সামান্য পরিমানে নাইট্রেট ধারণ করে। বীজ এবং ফুলে নাইট্রেট প্রায় থাকে না বললেই চলে।

১১.মাত্রাধিক্য সার ব্যবহারঃ অধিক হারে নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ সার ব্যবহার করলে শস্যে নাইট্রেটের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

 

নাইট্রেট কেন বিষাক্ত

নাইট্রেটযুক্ত ফরেজ প্রানী গ্রহন করার পর রুমেন ব্যাকটেরিয়া দ্রুত ফরেজের নাইট্রেটকে নাইট্রাইটে রুপান্তরিত করে। সাধারনত এই নাইট্রাইট এমোনিয়াতে রুপান্তরিত হয় এবং নাইট্রোজেনের উৎস হিসাবে রুমিনাল ফ্লোরা কর্তৃক ব্যবহৃত হয়। যদি এমোনিয়া উৎপাদনের চেয়ে নাইট্রেট গ্রহনের পরিমান বেশি হয় তাহলে রুমেনের মধ্যে নাইট্রাইট সঞ্চিত হতে থাকে। নইট্রাইট দ্রুত রক্তে শোষিত হয়ে রক্তের হিমোগ্লোবিনকে মিথ-হিমোগ্লোবিনে পরিনত করে। এই অবস্থায় মিথ-হিমোগ্লোবিন রক্ত কনিকা মাংসপেশী এবং টিস্যুর মধ্যে অক্রিজেন সরবরাহ করতে পারে না। ফলে অক্রিজেনের অভাবে প্রাণীর মৃত্যু ঘটে।

 

নাইট্রেট বিষক্রিয়ার লক্ষণসমূহ

ক, তীব্র লক্ষণ

  • শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়
  • মাংসপেশী কাঁপতে থাকে
  • অসংলগ্নভাবে চলাফেরা
  • দ্রুত এবং দুর্বল হৃৎস্পন্দন
  • পাতলা পায়খানা
  • ঘন ঘন প্রস্রাব
  • দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা না করলে ৪ থেকে ৯ ঘন্টার মধ্যে মৃত্যু ঘটে

 

খ, দীর্ঘস্থায়ী লক্ষণসমূহ

  • দৈহিক বৃদ্ধি হ্রাস পায়
  • দুধ উৎপাদন কমে যায়
  • গর্ভপাত হতে পারে

 

বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত গাভী শুয়ে পড়েছে

চিকিৎসা

১.নাইট্রেট বিষক্রিয়া সন্দেহ করা হলে সঙ্গে সঙ্গে সমুদয় খাদ্যশস্য সরিয়ে ফেলে বেশি এনার্জিযুক্ত খাবার সরবরাহ করতে হবে।

২.পশুর প্রতি কেজি ওজনের জন্য ১০মিলিগ্রাম হারে ৪% মিথাইলিনব্লু শিরার মধ্যে ইনজেকশন দিতে হবে। ৬-৮ ঘন্টা পর পুনরায় ইনজেকশন করতে হবে।

 

নাইট্রেট বিষক্রিয়া হ্রাস করার পদ্ধতি

১,ঘাসের জমিতে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন যুক্ত সার/ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

২,ধকলে পতিত ফরেজকে বেশি বিলম্ভে সংগ্রহ করতে হবে।

৩,উচ্চমাত্রার নাইট্রেটযুক্ত ফরেজকে হে করার পরিবর্তে সাইলেজ করে সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ এনসাইলিং ফরেজ গাজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফরেজের নাইট্রেট ৪০-৬০% হ্রাস পায়।

৪,শস্যজাতীয় ফরেজের নিন্মাংশে বেশি নাইট্রেট থাকে বলে তা অনেক উপর থেকে কাটতে হয়।

 

প্রতিকার এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনা

১,নাইট্রেট সমৃদ্ধ খাদ্যের সাথে ক্রমশ খাপ খাওয়ানো

ফরেজে যদি নাইট্রেটের মাত্রা খুব বেশি না হয় তাহলে খাদ্যে এর পরিমান বাড়িয়ে খাপ খাওয়ানো যায়।

২,অন্য খাদ্যের সাথে খাওয়ানো

উচ্চ নাইট্রেটযুক্ত ফরেজকে কম নাইট্রেটযুক্ত খাদ্যের সাথে খাওয়ানোর ক্ষেত্রে ১ঃ১ অনুপাতে মিশ্রণ করে খাওয়াতে হবে।এভাবে ৩-৪ সপ্তাহ খাওয়ানোর পর গবাদিপশু সাধারনত নাইট্রেটের সাথে খাপ খেয়ে যায় এবং পরবর্তী পর্যায়ে নাইট্রেট সমৃদ্ধ ফরেজের অনুপাত ধীরে ধীরে বাড়ানো যেতে পারে।

৩,অতিরিক্ত দানাদার খাদ্য এবং এনার্জিসমৃদ্ধ খাদ্য সরবরাহ

রসদের মধ্যে দানাদার খাদ্য ১-১.৫ কেজি বৃদ্ধি করলে নাইট্রেটের পরিমান হ্রাস পায়।তবে,এই সাথে রুমেন ব্যাকটেরিয়ার জন্য প্রয়োজনিয় শক্তি সরবরাহ করতে হবে যাতে এরা দ্রুত নাইট্রাইটকে এমোনিয়াতে রুপান্তর করতে পারে।

৪,সুষম খাদ্য খঅওয়ানো

খাদ্যের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমান প্রোটিন,ভিটামিন এ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

৫,অসুস্থ গবাদিপশুকে খাওয়ানো যাবে না

সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান গবাদিপশূর চেয়ে অসুস্থ, ক্ষুধার্ত, গর্ভবতী এবং দুগ্ধবতী গবাদিপশুর উচ্চমাত্রার নাইট্রেট প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা কম থাকে বিধায় এদেরকে এ জাতীয় খাদ্য দেয়া যাবেনা।

৬,বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ

পর্যাপ্ত পরিমান বিশুদ্ধ পানি পান অব্যাহত রাখলে নাইট্রেটের মাত্রা হ্রাস পায়।

 

 

উপসংহার

নাইট্রেটের বিষক্রিয়া থেকে গবাদিপশুর প্রানহানি হতে পারে। তাই গবাদিপশু পালনকারীদের জন্য এ বিষয়ে সম্যক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। উদ্ভিদে নাইট্রেটের পরিমান কীভাবে কম রাখা যায় এবং নাইট্রেটের মাত্রা কম করে কীভাবে তা ব্যবহার করা যেতে পারে তা জানা বিশেষ প্রয়োজন। এজন্য নিয়মিতভাবে নাইট্রেট টেস্ট সম্পাদন বিশেষ জরুরি। জমিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগও সীমিত রাখা প্রয়োজন। এ সমস্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি খামারীদের জানা থাকলে নাইট্রেট বিষক্রিয়ায় গবাদিপশুর মৃত্যু নিয়ন্ত্রন করা যাবে।

লেখকঃ ডাঃ শামীম আহমেদ

I am working as Veterinary Surgeon at Upazila Livestock Office, Atgharia, Pabna Mobile: 01714716736 E-mail: shamim_213@yahoo.com

এটাও দেখতে পারেন

কোরবানীর গরুর ক্যালসিনোসিস বা সিউডোগাউট

ক্যালসিনোসিস বা সিউডোগাউট বেশীরভাগ সময় কোরবানীর অল্প কিছুদিন আগে দেখা যায়। এটি মোটাতাজা হয়ে যাওয়া গরুর …

৫ মন্তব্য

  1. আপনার তথ্যবহুল উপস্থাপনার জন্য ধন্যবাদ। আমার একটি প্রশ্ন । নাইট্রেট বিষক্রিয়া এর চিকিৎসা তে মিথাইলিনব্লু আছে । এইটি কোঁথাই পাবো ? ইহার বিকল্প কিছু আছে কি?

  2. জাকির (এ.আই) কালিগজ, সাতক্ষিরা .

    খুব ভাল .এটা একটা বড় সমস্যা গরু মোটাতাজাকরন কারিদের. জানতে চাই সরাসরি ওষধের নাম.কোনও গ্রুপ নাম না.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.